(৫) বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব: নবাব সিরাজউদ্দৌলা (শাসনকাল: ১৭৫৬–১৭৫৭ খ্রি.)।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব: নবাব সিরাজউদ্দৌলা (শাসনকাল: ১৭৫৬–১৭৫৭ খ্রি.)।
✍️ লেখক: আব্দুর রাকিব নাদভী
ভূমিকা: অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে বাংলা ছিল উপমহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও বহিঃশক্তির কূটচালে এই সমৃদ্ধ প্রদেশ দ্রুত রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। এই সন্ধিক্ষণে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা—যিনি ইতিহাসে বাংলার স্বাধীনতার শেষ নবাব হিসেবে পরিচিত।

জন্ম ও উত্তরাধিকার: সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন নবাব আলীবর্দী খানের দৌহিত্র। জন্ম: ১৭৩৩ খ্রিষ্টাব্দ (মুর্শিদাবাদ)। আলীবর্দী খান জীবদ্দশায় তাঁকে উত্তরসূরি মনোনীত করেন। ১৭৫৬ সালে আলীবর্দী খানের ইন্তেকালের পর মাত্র ২৩ বছর বয়সে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন।

শাসনামলের চ্যালেঞ্জ: সিরাজ সিংহাসনে বসার পরপরই নানা সমস্যার সম্মুখীন হন: অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র: দরবারে মীর জাফর, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ প্রমুখ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাঁর বিরোধিতা করেন।

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি: তারা কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছিল, যা নবাবের অনুমতি ছাড়া করা হচ্ছিল।
রাজনৈতিক অস্থিরতা: প্রদেশে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ে।

কলকাতা অভিযান (১৭৫৬): ইংরেজদের অবাধ সামরিক প্রস্তুতির প্রতিবাদে সিরাজ কলকাতা আক্রমণ করেন এবং ফোর্ট উইলিয়াম দখল করেন। এই ঘটনাকে ঘিরে “ব্ল্যাক হোল” বিতর্কিত কাহিনি প্রচারিত হয়, যা পরবর্তীকালে ব্রিটিশরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে।

পলাশীর যুদ্ধ (২৩ জুন ১৭৫৭): বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো পলাশীর যুদ্ধ।
ইংরেজ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী ও মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাবের সেনাবাহিনী কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
যুদ্ধক্ষেত্রে সিরাজ পরাজিত হন। পরবর্তীতে তিনি বন্দী ও নিহত হন। এই যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলায় ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনা হয় এবং ভারতবর্ষে উপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন:  ঐতিহাসিকদের মধ্যে সিরাজউদ্দৌলার চরিত্র নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ তাঁকে আবেগপ্রবণ ও অভিজ্ঞতাহীন শাসক হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ তাঁকে বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকারী সাহসী যুবক নবাব হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।
তবে একথা অনস্বীকার্য যে, তাঁর পতনের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীন নবাবি শাসনের অবসান ঘটে।

উপসংহার: নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইতিহাসে এক ট্র্যাজিক নায়ক। তাঁর স্বল্পকালীন শাসন ও পলাশীর পরাজয় শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনই নয়; বরং তা ভারতীয় উপমহাদেশে দুই শতাব্দীর ব্রিটিশ শাসনের দ্বার উন্মোচন করে।
বাংলার স্বাধীনতার শেষ নবাব হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Comments

Popular posts from this blog

ভারত বর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের অবদান। আব্দুর রাকিব নাদভী

ওয়াকফ আইন ও মুসলিম ঐক্য

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভূমিকা।