ভারত বর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের অবদান। আব্দুর রাকিব নাদভী

ভারত বর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের অবদান 
আব্দুর রাকিব নাদভী 
শেরশাহবাদি সম্প্রদায় উপমহাদেশের সেইসব দেশপ্রেমিক ও গর্বিত সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি যাঁরা তাঁদের জীবন, সম্পত্তি এমনকি তাঁদের ঘরবাড়িও উৎসর্গ করে স্বাধীনতার মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এ সম্প্রদায় মূলত ভারতের বিভিন্ন রাজ্য যেমন বাঙ্গাল-বিহার এবং ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা, আসাম বসবাস করে। (বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ, উঃ দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, এবং বিহারের কাটিহার, পূর্ণিয়া, আরারিয়া এবং কিষাণগঞ্জ এবং ঝাড়খন্ডে পাকুর, সাহেবগঞ্জ ইত্যাদি জেলা এবং এর আশেপাশের অঞ্চলে বসবাস করে। এবং ভারতের বাহিরে এদের বসবাস বাংলাদেশ, নেপাল ও মালদ্বীপ ইত্যাদিতেও রয়েছে। এদের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক কেবল তাঁদের স্থানীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং দেশের বিভিন্ন প্রদেশেও ছিল, এর কারণেই স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁদের প্রভাব ও অনুভূত সারা দেশে বিস্তৃত হয়েছিল।

শেরশাহবাদি জাতির ঐতিহাসিক পটভূমি সাক্ষ্য বহন করে যে এ জাতি শতাব্দী ধরে জ্ঞান, বাণিজ্য এবং কৃষিক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা এবং বিহার দখল করে, তখন সর্বপ্রথম এই জাতিই ভারী কর, নিপীড়ন এবং অর্থনৈতিক শোষণেরও সম্মুখীন হয়েছিলেন। ব্রিটিশ নীতিগুলি কেবল কৃষকদের ঋণী করেনি বরং তাঁদের বাণিজ্য সুযোগও সীমিত করেছিল, যার ফলে জনগণের মধ্যে অস্থিরতা এবং বিদ্রোহ দেখা দেয়।

১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের লোকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, যাকে কিছু ঐতিহাসিক "রাষ্ট্রদ্রোহ" এবং কেউ কেউ "ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ" বলে অভিহিত করেছেন। শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ 
করেছেন, যদিও ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম ভালভাবে সংরক্ষিত নেই, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং মৌখিক ইতিহাস থেকে জানা যায় যে এই সম্প্রদায়ের অনেক সদস্যকে কামানের সাথে বেঁধে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং অনেক সদস্যকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যখন স্বাধীনতা আন্দোলন একটি সংগঠিত রূপ নেয়, তখন শেরশাহবাদি যুবকরাও জাতীয় মঞ্চে তাঁদের উপস্থিতি নিবন্ধন করেছিলেন। কেউ কেউ ভারতীয় কংগ্রেসের সভা এবং সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, আবার কেউ কেউ মুসলিম লীগের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের ভূমিকা পালন করেছিলেন। খিলাফত আন্দোলনে (১৯১৯-১৯২৪), শেরশাহাবাদি ওলামা এবং ছাত্ররাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গের মালদা , মুর্শিদাবাদ উঃ দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর এবং বিহারের কাটিহার, আরারিয়া, পূর্ণিয়া ও কিষানগঞ্জ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মাদ্রাসার ওলামায়ে কেরাম যারা জনগণের মাঝে ইংরেজ বিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধি করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনকি লবণ সত্যাগ্রহ, অসহযোগ আন্দোলন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (১৯৪২), শেরশাহাবাদী যুবকরাও মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন, ইংরেজি পণ্য বর্জন করেছিলেন এবং কারাবাসের কষ্ট সহ্য করেছিলেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই সম্প্রদায়ের আলেমরা মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। বিশেষ করে জুমার খুতবা এবং ধর্মীয় জালসা,  কুরআনের মহফিল গুলিতেও ব্রিটিশদের অত্যাচার ও নিপীড়নের কথা বলে জনগণকে সচেতন ও জাগ্রত করতেন এবং  ত্যাগ ও ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিতেন। বেশ কয়েকজন আলেমের বিরুদ্ধে "রাষ্ট্রদ্রোহ" এবং "দুর্নীতির" অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং জেল বা গৃহবন্দী করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম সংক্ষেপে নিম্নলিখিত পংক্তিগুলিতে উল্লেখ করা হচ্ছে:
১. মৌলভী আব্দুল করিম শহীদ (কাটিহার):
১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি স্থানীয় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে জনগণকে বিদ্রোহের জন্য উস্কে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে কামানের মুখের সাথে বেঁধে শহীদ করে।
২. মাওলানা ফখরুদ্দিন (পূর্ণিয়া):
খিলাফত আন্দোলন এবং অসহযোগ আন্দোলনের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সভা করেছেন। ১৯২২ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দুই বছর জেলে বন্দি থাকেন।
৩. হাজী আব্দুল গফুর মক্কী (কিশনগঞ্জ):
তিনি ব্যবসার জন্য মক্কায় যান এবং সেখানে গিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামী সভার সাথে যুক্ত হন। ফিরে এসে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী লেটরিচার বিতরণ করেন। বেশ কয়েকবার তিনি আরেসট হন এবং কারাবাসের কষ্ট সহ্য করেছিলেন।
৪. মৌলভী আব্দুল হক বিহারী (আরারিয়া):
তিনি "ভারত ছাড়ো আন্দোলন" (১৯৪২) -এ স্থানীয় কাফেলাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সাথে সশস্ত্র সংঘর্ষে তিনি আহত হন। কারাগারে তিনি ভয়াবহ নির্যাতন সহ্য করেছিলেন কিন্তু উদ্দেশ্য থেকে পিছে সরে যাননি।
৫. বিবি জিনাত খাতুন (কাটিহার):
তিনি প্রথম শেরশাহবাদি মহিলা, যিনি মহিলাদের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত করেছিলেন। তিনি মুজাহিদিনদের জন্য খাবার এবং পোশাক সরবরাহ করতেন। পুলিশ আক্রমণে আহত হন, তবুও নিজ উদ্দেশ্যে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

৬. মাওলানা সাঈদ আহমেদ কিশগঞ্জ:
তিনি খুতবা এবং ধর্মীয় সমাবেশে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জনগণকে উত্তেজিত করতেন। ১৯৩০-এর দশকে তাকে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরেও তিনি আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
৭. মৌলভী শামসুদ্দিন ফুলওয়ারভী (পূর্ণিয়া):
১৮৫৭ সালের পর, তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গেরিলা-ধাঁচের প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি অভিযান পরিচালনায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন। অবশেষে তিনি ঘেরাও হয়ে শহীদ হন।

এগুলি কেবল কয়েকটি নাম যা জনসাধারণের স্মৃতি এবং স্থানীয় ইতিহাস থেকে সংরক্ষিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, শেরশাহবাদি গোত্রের অসংখ্য মানুষ স্বাধিনতা লাভের উদ্দেশ্যে তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু দুঃখজনক বিষয় 
তাঁদের নাম ইতিহাসের মূলধারায় স্থান পায়নি। আজ প্রয়োজন তাঁদের সম্পর্কে গবেষণা করা, তাঁদের নাম, জীবনী এবং কৃতিত্ব সংরক্ষণ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাঁদের সম্পর্কে অবহিত করা, যে স্বাধীনতার এই মূল্যবান উপহারটি কীভাবে অসংখ্য বেনামী ত্যাগের ফল।

শেরশাহবাদির মহিলারাও স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন, যেমন প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত লাইনগুলিতে বিবি জিনাত খাতুন সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। যদিও তাঁদের ভূমিকা বেশিরভাগই পর্দার আড়ালে ছিল, তাঁরা মুজাহিদিনদের খাদ্য, পোশাক এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করতেন। কিছু জায়গায়, মহিলারা সরাসরি বিক্ষোভ এবং প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং ব্রিটিশ পুলিশের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
দুঃখের বিষয় যে শেরশাহবাদি জাতির স্বাধীনতার জন্য প্রদত্ত বেশিরভাগ আত্মত্যাগ লিখিত ইতিহাসে সংরক্ষণ করা যায়নি, কারণ এ মানুষগুলির বেশিরভাগই গ্রামীণ অঞ্চলে অবস্থিত ছিলেন এবং তাঁদের সংগ্রাম লিপিবদ্ধ করার জন্য গ্রাম-অঞ্চলে তখন কোনও ব্যবস্থাও ছিল না। তবে, স্থানীয় গল্প, প্রবীণদের বক্তব্য এবং জনসাধারণের স্মৃতিচারণ এখনও এই সত্যের সাক্ষ্য দেয় যে, স্বাধীনতার লড়াইয়ে এই জাতি অন্যদের থেকে পিছিয়ে ছিলেন না, বরং সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এ জাতির ভূমিকা ও অবদান স্বর্ণের উজ্জ্বল এবং প্রয়োজন তা সংরক্ষণ করা।
স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি জাতির ভূমিকা আজ অলিখিত, বা এ জাতির ইতিহাস কে মূলত উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রয়োজন শেরশাহবাদি জাতির ইতিহাসকে প্রামাণ্য আকারে সংরক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতার মূল্য জানতে পারে। এই জাতি কেবল তাঁর অঞ্চলের নয়, সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিল এবং আজও তাদের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে দেশপ্রেম এবং দেশের জন্য আত্মত্যাগ ও সম্মানের একই চেতনা জীবিত।

Comments

Popular posts from this blog

ওয়াকফ আইন ও মুসলিম ঐক্য

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভূমিকা।