সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় জমঈয়তে আহলে হাদীস হিন্দের সম্মিলিত ফতোয়া।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় জমঈয়তে আহলে হাদীস হিন্দের সম্মিলিত ফতোয়া
অনুবাদক: আব্দুর রাকিব নাদভী
কেন্দ্রীয় জমিয়তে আহলে হাদিস হিন্দের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিবেদন বড় বড় ইসলামিক স্কলার এবং প্রায় এক ডজন আলেম সমাজের স্বাক্ষর সহিত ফতোয়া জারি করা হয়েছে।
প্রশ্ন: বর্তমানে বিশ্বে সন্ত্রাসের নামে শোরগোল চলছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে শুরু করে স্থানীয় গণমাধ্যম, সর্বত্রই সন্ত্রাসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এবং সন্ত্রাস বর্তমানে নানা রূপ ধারণ করেছে। যেমন: বিস্ফোরণ, নাশকতা, প্রাক হাইজ্যাকিং, অপহরণ, হত্যা, সুইসাইড স্কোয়াড, প্লেন হাইজ্যাক করে যাত্রীদের নিয়ে ধ্বংস করা, বাস হাইজ্যাক করে ধ্বংস করা। এই ধরণের সন্ত্রাসের ফলে সম্পদ নষ্ট হয়, সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হয়। জনসাধারণের বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করা হয়। এবং হারিয়ে যাচ্ছে নিষ্পাপ মানুষের প্রাণ। এসব বিষয়ে আলেম সমাজ ও ইসলামিক পন্ডিত মুফতিদের মতামত কি? ব্যাখ্যা করুন। উপরে উল্লিখিত ক্রিয়াকলাপ সমূহের কি কোথাও কোন ক্ষেত্রে বৈধতা আছে? শরীয়তের দৃষ্টিতে তাঁদের অবস্থান কি? এবং শরীয়ত তাঁদেরকে কোন দৃষ্টিতে দেখে ?
উত্তর: প্রশ্নে উল্লিখিত কর্মের জন্য শরীয়তে কোন সুযোগ নেই। ইসলামে তাদের কদর্যতা ও অবৈধতা স্পষ্ট। উক্ত কার্যকলাপকে আপনি যে কোন নাম দিন বা তাঁর পিছনে যে কোন কারণ ব্যাখ্যা করুন, প্রথমত এটি একেবারে অগ্রহনযোগ্য ও প্রত্যাখ্যাত।
এই ধরণের কাজ একজন মুসলিম করুক বা অমুসলিম করুক, কোন মুসলিম দেশেই হোক বা অমুসলিম দেশেই হোক, সব ক্ষেত্রেই এটি অবৈধ ও হারাম।
ঘটনা হল, যখন কোন স্থানে বিস্ফোরণ হয় অথবা অপহরণ ও হত্যা কান্ড ঘটে, অথবা আত্মঘাতী হামলা হয় অথবা সাধারণ যানবাহন বা প্লেন হাইজ্যাক বা ছিনতাই হয়, তখন মানুষের জীবন, ধন সম্পদ, সম্মান, সুনাম, ধর্ম ও বিশ্বাস এবং জনশান্তি বিনষ্ট হয়। আর সাধারণ মানুষ তাঁদের অন্যায় কাজের শাস্তি পায়। সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস হয়। মানুষ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। এবং ধার্মিক মূল্যবোধ লঙ্খিত হয়। ইসলাম ধর্ম উক্ত সকল ক্ষেত্রে সুরক্ষার গ্যারান্টি দিয়েছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
مِن أَجلِ ذٰلِكَ كَتَبنا عَلىٰ بَنى إِسرٰءيلَ أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفسًا بِغَيرِ نَفسٍ أَو فَسادٍ فِى الأَرضِ فَكَأَنَّما قَتَلَ النّاسَ جَميعًا وَمَن أَحياها فَكَأَنَّما أَحيَا النّاسَ جَميعًا ۚ وَلَقَد جاءَتهُم رُسُلُنا بِالبَيِّنٰتِ ثُمَّ إِنَّ كَثيرًا مِنهُم بَعدَ ذٰلِكَ فِى الأَرضِ لَمُسرِفونَ إِنَّما جَزٰؤُا۟ الَّذينَ يُحارِبونَ اللَّهَ وَرَسولَهُ وَيَسعَونَ فِى الأَرضِ فَسادًا أَن يُقَتَّلوا أَو يُصَلَّبوا أَو تُقَطَّعَ أَيديهِم وَأَرجُلُهُم مِن خِلٰفٍ أَو يُنفَوا مِنَ الأَرضِ ۚ ذٰلِكَ لَهُم خِزىٌ فِى الدُّنيا ۖ وَلَهُم فِى الِاخرة عَذابٌ عَظيمٌ
অর্থাৎ: এ কারণেই আমি বনী-ইসলাঈলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবাপৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে। তাদের কাছে আমার পয়গম্বরগণ প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী নিয়ে এসেছেন। বস্তুতঃ এরপরও তাদের অনেক লোক পৃথিবীতে সীমাতিক্রম করে। যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। ( সুরা আল মায়েদা আয়াত নং ৩২-৩৩)
উক্ত আয়াত দুটি থেকে স্পষ্ট যে, ইসলাম ধর্মে হুদূদ অর্থাৎ সীমাবদ্ধতা এবং কেসাস অর্থাৎ প্রতিশোধ এর আইনের উদ্দেশ্য হল মানুষের জীবন ও সম্পদ, সম্মান ও মর্যাদা এবং ধর্ম রক্ষা করা এবং জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন ভঙ্গ করার সুযোগ না পায়। এবং এই ধরনের দুষ্টকর্মে লিপ্ত হয়ে সমাজে দাঙ্গা ও অশান্তি সৃষ্টি না করতে পারে। যারা এই কাজে যুক্ত পাওয়া যাবে তাঁদের জন্য রয়েছে কঠর শাস্তি । স্বয়়ং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
وَمِنَ النّاسِ مَن يُعجِبُكَ قَولُهُ فِى الحَيوٰةِ الدُّنيا وَيُشهِدُ اللَّهَ عَلىٰ ما فى قَلبِهِ وَهُوَ أَلَدُّ الخِصامِ وَإِذا تَوَلّىٰ سَعىٰ فِى الأَرضِ لِيُفسِدَ فيها وَيُهلِكَ الحَرثَ وَالنَّسلَ ۗ وَاللَّهُ لا يُحِبُّ الفَسادَ
অর্থ: আর এমন কিছু লোক রযেছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করবে। আর তারা সাক্ষ্য স্থাপন করে আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে। প্রকৃতপক্ষে তারা কঠিন ঝগড়াটে লোক। যখন ফিরে যায় তখন চেষ্টা করে যাতে সেখানে অকল্যাণ সৃষ্টি করতে পারে এবং শস্যক্ষেত্র ও প্রাণনাশ করতে পারে। আল্লাহ ফাসাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা পছন্দ করেন না। ( সুরা আল বাকারাহ আয়াত নং ২০৪ - ২০৫)
যারা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ফাসাদ ছড়ায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁদেরকে কখনো পছন্দ করেন না। আর ইসলাম ধর্ম এটাকে কোন দিন ও কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারে না। এর উদাহরণ হচ্ছে অসুস্থ হৃদয়ের মত। যা মানুষের বিবেক ও বুদ্ধিকে নষ্ট করে ফেলে। ফলে সে হট মেজাজ হয়ে যায় এবং ঘৃণা ও শত্রুতা তাদের চিন্তাধারায় প্রবেশ করে, প্রতিশোধ তাদের লক্ষ্যে পরিণত হয়, তখন সে দ্বীন, ধর্ম ও আইনের কোন পরোয়া করে না। এবং সে ব্যাপক আকারে দুর্নীতি ও দুষ্টকর্মে যুক্ত হয়ে পরে।এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে। পবিত্র আল কোরআন তাঁদের অপরাধমূলক কর্মকে ব্যাপক আকারে নিন্দা করেছে। এবং ইতিবাচক আচরণ অবলম্বন করতে উৎসাহিত করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
يٰأَيُّهَا الَّذينَ ءامَنوا كونوا قَوّٰمينَ لِلَّهِ شُهَداءَ بِالقِسطِ ۖ وَلا يَجرِمَنَّكُم شَنَـٔانُ قَومٍ عَلىٰ أَلّا تَعدِلُوا ۚ اعدِلوا هُوَ أَقرَبُ لِلتَّقوىٰ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبيرٌ بِما تَعمَلونَ
অর্থ: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত। ( সুরা আল মায়েদা আয়াত নং ৮)
অর্থাৎ যদি কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বা জাতির সাথে তোমাদের শত্রুতা থাকে, তবে প্রতিশোধ ও শত্রুতার নেশায় তোমরা সীমাবদ্ধতা লঙ্ঘন কর না এবং তাঁদের ব্যাপারে নিষ্ঠুরতা ও অবিচারের মনোভাব পোষণ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। বরং এর বিপরীতে, ইসলামের নির্দেশনা স্পষ্ট : সর্বদা ন্যায়বিচার করতে হবে।
উল্লিখিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দ্বারা শুধু বিশেষ ব্যাক্তির ক্ষতি হয় না, কখনও কখনও উক্ত কর্মকাণ্ড সমাজের জন্যে মারাত্মক ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করে এবং হাজার হাজার নিষ্পাপ মানুষের প্রাণ যায়। এবং অসংখ্য সরকারী ও বেসরকারী সম্পত্তি ধ্বংস হয়।
সমাজ ও দেশের জন্য এতো ক্ষতিকারক ও বিপদজনক হওয়া সত্বেও কি এসব কর্মের অবৈধতা সম্পর্কে সন্দেহ করা যায়? এই ধরণের সকল কর্মকান্ড একেবারেই অবৈধ ও হারাম।
সকল ক্ষেত্রে ও সকলের সাথে ন্যায়বিচার করার নির্দেশনা গ্রন্থ আল কোরআনের বিভিন্ন আয়াত সমূহে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأمُرُ بِالعَدلِ وَالإِحسٰنِ وَإيتائِ ذِى القُربىٰ وَيَنهىٰ عَنِ الفَحشاءِ وَالمُنكَرِ وَالبَغىِ ۚ يَعِظُكُم لَعَلَّكُم تَذَكَّرونَ
অর্থ: আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্নীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখ। (সুরা আন্ নাহাল আয়াত নং ৯০)
এই আয়াতে ন্যায়পরায়ণ, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ এবং ব্যভিচার, নির্লজ্জকাজ, অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা, বিদ্রোহ, বিশ্বাসঘাতকতা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
শরীয়তে প্রতিটি অত্যাচার ও সহিংসতা এবং অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার রয়েছে এবং তার পদ্ধতিও নির্ধারিত রয়েছে। যাদের অপসারণের অধিকার দেয়া হয়েছে, একমাত্র তারাই এই অধিকার ব্যবহার করা উচিত এবং অনাচারে মানুষ অসন্তুষ্টি অনুভব করবে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে মুসলিম উম্মাহকে সকল ধরনের দুর্ব্যবহার করা থেকে নিষিদ্ধ করেছেন। এই মর্মে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
وَالَّذينَ يُؤذونَ المُؤمِنينَ وَالمُؤمِنٰتِ بِغَيرِ مَا اكتَسَبوا فَقَدِ احتَمَلوا بُهتٰنًا وَإِثمًا مُبينًا
অর্থ: যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে। (সুরা আল আহযাব আয়াত নং ৫৮)
আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
كل المسلم على المسلم حرام دمه وماله وعرضه
অর্থ: এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে খুন করা, তার মাল গ্রাস করা ও সম্মানে আঘাত দেয়া হারাম। (সহীহ মুসলিম কিতাবুল বির অসেলাহ হাদীস নং ৬৭০৬)
عن عبد الله بن عمرو رضي الله عنهما عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده
অর্থ: হযরতআবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: সেই প্রকৃত মুসলিম, যার জিহবা ও হাত হতে সকল মুসলিম নিরাপদ ।
)সহীহ আল বুখারী কিতাবুল ঈমান হাদিস নং ১০)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম আরও বলেন:
وإن الله أوحى إلي أن تواضعوا حتى لا يفخر أحد على أحد ولا يبغي أحد على أحد.
অর্থাৎ: আল্লাহ রব্বুল আলামীন ওহীর মাধ্যমে নির্দেশনা দিয়েছে যে, তোমরা নম্রতা অবলম্বন কর।যাতে কেউ অপরের উপর অত্যাচার না করে। এবং কেউ কাউকে নিয়ে গর্ব না করে। (সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৭৩৮৯)
উক্ত হাদিস ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, কোন মুসলিম ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় ওপর কোন ব্যক্তিকে কষ্ট দেওয়া বা তার জান, মাল, ধন সম্পদ এবং সম্মান নিয়ে খেলাধুলা করা। অথবা কোন ব্যক্তির উপর অন্যায় ও অত্যাচার করা।

Comments
Post a Comment