ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের সূচনা (১৭৫৭ খ্রি.)।

ব্রিটিশ শাসনের সূচনা
পলাশীর প্রান্তর থেকে উপনিবেশিক ভারতের জন্ম
✍️ লেখক: আব্দুর রাকিব নাদভী
ভূমিকা: ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল দীর্ঘ বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলের ফল। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলার পলাশীর প্রান্তরে সংঘটিত একটি যুদ্ধ—পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭ খ্রি.)—ভারতের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করে। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি রচিত হয়।

বাণিজ্য থেকে রাজনীতি: ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে শুধুমাত্র বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ভারতে আসে। সুরাট, মাদ্রাজ, বোম্বাই ও কলকাতায় তারা কারখানা ও বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে। ধীরে ধীরে তারা সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং স্থানীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ শুরু করে।
বাংলা তখন ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ—মসলিন, সিল্ক ও নীলের জন্য বিখ্যাত। ফলে কোম্পানির দৃষ্টি বাংলার দিকে নিবদ্ধ হয়।

পলাশীর যুদ্ধ: এক মোড় পরিবর্তন
২৩ জুন ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা নবাবের পরাজয়ের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে কোম্পানি বিজয় অর্জন করে। মীর জাফরকে নবাব বানানো হয়, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা কোম্পানির হাতে চলে যায়। এই যুদ্ধ ছিল ব্রিটিশদের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সূচনা।

দ্বৈত শাসন ও দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫): ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয় কোম্পানিকে বাংলার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) প্রদান করেন। এর ফলে: প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। বাংলায় “দ্বৈত শাসন” ব্যবস্থা চালু হয়। কোম্পানি রাজস্ব আদায় করে, আর নবাব নামমাত্র শাসক হিসেবে থাকেন। এভাবেই বাণিজ্যিক সংস্থা থেকে কোম্পানি একটি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব: অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ে কৃষকশ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়।
ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও বাণিজ্য ধীরে ধীরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বাংলার অর্থনৈতিক শক্তি ক্ষয় হতে শুরু করে এবং ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের বাজারে ভারত পরিণত হয়।

উপসংহার:
ব্রিটিশ শাসনের সূচনা পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে হলেও তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা, কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ বিভেদের সুযোগ গ্রহণের মাধ্যমে। এই সূচনা পরবর্তীকালে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ও সরাসরি ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে। পলাশীর প্রান্তর শুধু একটি যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি ভারতীয় ইতিহাসে স্বাধীনতার অবসান ও উপনিবেশিক শাসনের সূচনার প্রতীক।

Comments

Popular posts from this blog

ভারত বর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের অবদান। আব্দুর রাকিব নাদভী

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভূমিকা।

বাংলা ভাষায় ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব।