(৪) সংকটের সময়ে দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক: নবাব আলীবর্দী খান (শাসনকাল: ১৭৪০–১৭৫৬ খ্রি.)।
নবাব আলীবর্দী খান (শাসনকাল: ১৭৪০–১৭৫৬ খ্রি.)। সংকটের সময়ে দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক।
ভূমিকা: অষ্টাদশ শতকের বাংলা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বহিঃশত্রুর আক্রমণে বিপর্যস্ত এক সময় অতিক্রম করছিল। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে যে শাসক দৃঢ়তা, সামরিক দক্ষতা ও প্রশাসনিক বিচক্ষণতার মাধ্যমে বাংলাকে রক্ষা করেন, তিনি হলেন নবাব আলীবর্দী খান। তাঁর শাসনকাল ছিল সংগ্রামময়, কিন্তু একই সঙ্গে তা ছিল বাংলার রাজনৈতিক স্থিতি পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রারম্ভিক জীবন ও উত্থান: আলীবর্দী খানের প্রকৃত নাম ছিল মির্জা মুহাম্মদ আলী। তিনি প্রথমে শুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খানের অধীনে প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত হন এবং পরবর্তীতে বিহারের নায়েব (ডেপুটি গভর্নর) নিযুক্ত হন।
১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে গিরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজ খানকে পরাজিত করে তিনি বাংলার নবাব পদে আরোহণ করেন। দিল্লির মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ পরবর্তীতে তাঁর নবাবত্ব অনুমোদন করেন।
মারাঠা আক্রমণ ও প্রতিরোধ: আলীবর্দী খানের শাসনামলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মারাঠা আক্রমণ (যা বাংলায় ‘বর্গী আক্রমণ’ নামে পরিচিত)। ১৭৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক আক্রমণে বাংলা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গ্রামাঞ্চলে লুটপাট ও অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে।
আলীবর্দী খান প্রতিরোধ গড়ে তুললেও দীর্ঘদিন যুদ্ধ চালাতে হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি মারাঠাদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছান এবং উড়িষ্যার একটি অংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তবুও তাঁর সামরিক নেতৃত্ব বাংলাকে সম্পূর্ণ পতনের হাত থেকে রক্ষা করে।
প্রশাসনিক নীতি: তিনি রাজস্বব্যবস্থা পুনর্গঠন করেন এবং প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।
ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর (ইংরেজ, ফরাসি, ডাচ) ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখেন। অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা বর্জন করে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করেন।
তাঁর শাসনামলে বাংলা বহিঃআক্রমণের মধ্যেও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বজায় রাখে।
চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব: ঐতিহাসিক বর্ণনায় আলীবর্দী খানকে কঠোর কিন্তু ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ধর্মপরায়ণ ছিলেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে সংযমী ছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সামরিক দক্ষতা তাঁকে অষ্টাদশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নবাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উত্তরাধিকার: ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা নবাব হন। আলীবর্দী খান জীবদ্দশায় সিরাজকে উত্তরসূরি মনোনীত করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরই বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তীকালে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয়।
উপসংহার: নবাব আলীবর্দী খানের শাসনকাল ছিল এক সংগ্রামী যুগ। মারাঠা আক্রমণ, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও বহিঃশক্তির চাপে থেকেও তিনি বাংলার সার্বভৌম মর্যাদা রক্ষা করেন।
তিনি ছিলেন সংকটের সময়ে দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক—যাঁর শাসন বাংলার ইতিহাসে স্থিতি ও প্রতিরোধের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
Comments
Post a Comment