ইসলামের আলোকে ভাষার গুরুত্ব।

ইসলামের আলোকে ভাষার গুরুত্ব।
ভূমিকা: ভাষা মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। চিন্তা, জ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশ ভাষার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ইসলাম ভাষাকে শুধু যোগাযোগের উপায় হিসেবে নয়; বরং আল্লাহপ্রদত্ত এক বিশেষ দান, দাওয়াহর হাতিয়ার এবং ইবাদতের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। পবিত্র আল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে ভাষার মর্যাদা ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান।

ভাষা: আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত: এই মর্মে বিশ্ব সৃষ্টি কর্তা আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন: 
الرَّحْمٰنُ ۝ عَلَّمَ الْقُرْآنَ ۝ خَلَقَ الْإِنسَانَ ۝ عَلَّمَهُ الْبَيَانَ
“পরম করুণাময়, তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে ভাষা (বাকশক্তি) শিখিয়েছেন। (সূরা আর-রহমান ৫৫:১–৪)। 
উল্লেখিত আয়াতে “আল বায়ান” শব্দ ব্যবহিত হয়েছে, এর অর্থ হচ্ছে ভাষাশক্তি,  যা  মানুষের ভাবনা ও চিন্তা প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। 

ইসলাম প্রচার ও প্রসারে ভাষার ভূমিকা: ইসলাম প্রচার ও প্রসারে ভাষার ভূমিকা অপরিসীম। বিশ্ব পালনকর্তা আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন: 
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ
“আমি প্রত্যেক রাসূলকে তার কওমের ভাষাতেই প্রেরণ করেছি।”(সূরা ইবরাহীম ১৪:৪)।
উক্ত আয়াত প্রমাণ করে যে, মানুষকে হেদায়েত দিতে হলে তার ভাষায় কথা বলা অপরিহার্য। একজন দায়ীর কর্তব্য স্বজাতির ভাষা শেখা। 
 
পবিত্র আল কুরআনের ভাষা: পবিত্র আল কুরআনের ভাষা আরবী, পবিত্র আল কুরআন নাযিল হয়েছে আরবি ভাষায়। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন: 
الر ۚ تِلكَ ءايٰتُ الكِتٰبِ المُبينِ، إِنَّا أَنزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا
আলিফ-লা-ম-রা; এগুলো সুস্পষ্ট গ্রন্থের আয়াত।আমি একে আরবী ভাষায় কোরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার।(সূরা ইউসুফ ১২:২)
আরবি ভাষা ইসলামী জ্ঞানের মূলভিত্তি। তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও আকীদার প্রকৃত উপলব্ধির জন্য আরবি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইসলাম অন্য ভাষাকে অস্বীকার করেনি; বরং ভাষাগত বৈচিত্র্যকে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন:
وَمِن ءايٰتِهِ خَلقُ السَّمٰوٰتِ وَالأَرضِ وَاختِلٰفُ أَلسِنَتِكُم وَأَلوٰنِكُم ۚ إِنَّ فى ذٰلِكَ لَءايٰتٍ لِلعٰلِمينَ
তাঁর আর ও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে। (সূরা রূম ৩০:২২)।

ভাষার নৈতিক ব্যবহার: বিশ্ব নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: 
وَمَنْ  كَانَ  يُؤْمِنُ  بِاللَّهِ  وَالْيَوْمِ  الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا  أَوْ  لِيَصْمُتْ 
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে। (সহীহ আল বুখারী: ৬০১৮)।
ভাষা মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে, আবার ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে। গীবত, অপবাদ, মিথ্যা ও কটূক্তি সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে, উপদেশ, যিকর, জ্ঞানচর্চা ও সত্যকথন সমাজকে আলোকিত করে। অতএব ভাষা ব্যবহারে সংযম ও সতর্কতা ঈমানের দাবি।

আধুনিক যুগে ভাষার দায়িত্ব: বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্লগ, ইউটিউব ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে ভাষার প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অতএব একজন সচেতন মুসলিম লেখক ও বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব: জাতির ভাষার উপর দক্ষতা অর্জন করে স্বজাতির মাঝে ইসলামের দাওয়াত, আকিদা, নৈতিকতা প্রচার ও প্রসার করা।

উপসংহার: ইসলামের আলোকে ভাষা আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত, হেদায়েতের মাধ্যম, ইলমের বাহন ও নৈতিক দায়িত্বের ক্ষেত্র। সুতরাং আমাদের কর্তব্য ভাষাকে শুদ্ধ করা, সংযত রাখা এবং দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত করা। ভাষার সঠিক ব্যবহার ব্যক্তি, সমাজ ও উম্মাহকে আলোকিত করতে পারে।

Comments

Popular posts from this blog

ভারত বর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের অবদান। আব্দুর রাকিব নাদভী

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভূমিকা।

বাংলা ভাষায় ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব।