(৭) ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধের নবাব: মীর কাসিম (শাসনকাল: ১৭৬০–১৭৬৩ খ্রি.)।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধের নবাব: মীর কাসিম (শাসনকাল: ১৭৬০–১৭৬৩ খ্রি.)।
ভূমিকা: মীর কাসিম (শাসনকাল: ১৭৬০–১৭৬৩) ছিলেন বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব। পলাশীর (১৭৫৭) পর কোম্পানির প্রভাব ক্রমশ বেড়ে গেলে তিনি প্রশাসনিক ও সামরিক সংস্কারের মাধ্যমে ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত চ্যালেঞ্জ গড়ে তোলেন। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সিরাজউদ্দৌলার পর তিনিই বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধকে নতুন মাত্রা দেন।
ক্ষমতায় আরোহন: ১৭৬০ সালে কোম্পানি মীর জাফরকে অপসারণ করে মীর কাসিমকে নবাব বানায়। শুরুতে তিনি কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতায় থাকলেও দ্রুত উপলব্ধি করেন যে প্রকৃত ক্ষমতা কোম্পানির হাতে সরে যাচ্ছে।
প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার: রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তর করেন। সেনাবাহিনী আধুনিকীকরণ ও ইউরোপীয় ধাঁচে প্রশিক্ষণ দেন। কোম্পানির দস্তক (করমুক্ত বাণিজ্য) সুবিধা বাতিল করে সকলের জন্য শুল্ক সমতা ঘোষণা করেন—যাতে দেশীয় ব্যবসায়ীরা বৈষম্যের শিকার না হন। এই নীতিই কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ ডেকে আনে।
সংঘাত ও যুদ্ধ: ১৭৬৩ সালে কোম্পানির সঙ্গে খোলা যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথমে কিছু সাফল্য পেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত হন। পরে তিনি শুজাউদ্দৌলা (আওধের নবাব) এবং শাহ আলম দ্বিতীয় (মুঘল সম্রাট) এর সঙ্গে জোটবদ্ধ হন।
বক্সারের যুদ্ধ : ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে কোম্পানির হাতে জোটবাহিনী পরাজিত হয়। এর ফলেই ১৭৬৫ সালে কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) লাভ করে—যা ব্রিটিশ শাসনের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করে।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন:
১. মীর কাসিম ছিলেন প্রশাসনিকভাবে দক্ষ ও দূরদর্শী।
২. তাঁর শুল্ক-সমতা নীতি ব্রিটিশ বাণিজ্যিক একচেটিয়াকরণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
৩. অনেক গবেষকের মতে, তিনিই বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী প্রথম সুসংগঠিত ও নীতিগত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা হারিয়ে নির্বাসিত জীবন কাটান এবং ১৭৭৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
উপসংহার: মীর কাসিমের সংগ্রাম ছিল কেবল ব্যক্তিগত ক্ষমতার লড়াই নয়; ছিল অর্থনৈতিক ন্যায় ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রচেষ্টা। তাঁর পরাজয়ের মধ্য দিয়েই বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
Comments
Post a Comment