ফুটি মসজিদ। আব্দুর রাকিব নাদভী।

ফুটি মসজিদ (ইতিহাস, স্থাপত্য ও গুরুত্ব)।
আব্দুর রাকিব নাদভী।
সহকারী শিক্ষক সুলতানপুর খুনিয়া পুকুর সিনিয়র মাদ্রাসা, মুর্শিদাবাদ।
মুর্শিদাবাদ বাংলা নবাবী আমলের এক গৌরবোজ্জ্বল রাজধানী। এই জনপদের প্রতিটি ইট-পাথরে ইতিহাসের ছাপ বিদ্যমান। কাতরা মসজিদ, হাজারদুয়ারি, মোতিজিল প্রাসাদ ইত্যাদির পাশাপাশি মুর্শিদাবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো ফুটি মসজিদ। যদিও এটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, তবুও এর ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব অপরিসীম।
নির্মাণকাল ও প্রতিষ্ঠাতা: ফুটি মসজিদ নির্মিত হয় ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে। এর নির্মাতা ছিলেন বাংলার নবাব সরফরাজ খান। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি সে সময় বাংলার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নবাব সরফরাজ খান গিরিয়া যুদ্ধে আলিবর্দী খানের কাছে পরাজিত হয়ে নিহত হন। নবাবের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই মসজিদের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মসজিদটি অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং পরবর্তীতে এটি “ফুটি” (অসম্পূর্ণ/ভাঙা) মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে। 
দুঃখের বিষয় হলেও এটি সত্য যে, মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে, আজ থেকে প্রায় ২৮৬ বছর পূর্বে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ২৮৬ বছর অতিবাহিত সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত মসজিদটির নির্মান কাজ সম্পন্ন হল না, এটি দুঃখের বিষয়। মনে রাখবেন, মসজিদ আল্লাহর ঘর, আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত হয়, এটি কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, তবে মসজিদটি অবহেলিত কেন? আমারা আল্লাহর দরবারে কি জবাব দেব? মুসলিম উম্মাহর উচিত ছিল মসজিদটি নির্মাণ ও আবাদ করা। 

অবস্থান: ফুটি মসজিদ মুর্শিদাবাদ শহরের কুমারপুর (কখনো বারোয়ারিতলা এলাকা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়) অঞ্চলে অবস্থিত। হাজারদুয়ারি প্রাসাদ থেকে এর দূরত্ব আনুমানিক ৩–৪ কিলোমিটার। বর্তমানে এটি প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত।

স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য: ফুটি মসজিদ মূলত মুঘল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। মসজিদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৫ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ৩৮ ফুট। পরিকল্পনায় এতে পাঁচটি বৃহৎ গম্বুজ থাকার কথা ছিল, কিন্তু কোনোটিই সম্পূর্ণ নির্মিত হয়নি। চার কোণে মিনার নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল, তবে সেগুলিও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
মসজিদের দেয়ালগুলো অত্যন্ত পুরু এবং লাল ইট ও চুন-সুরকির মিশ্রণে তৈরি। ভেতরের অংশে মিহরাবের নকশা আজও আংশিক দৃশ্যমান, যা সে সময়কার শিল্পরুচির পরিচয় বহন করে। অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও এর বিশাল কাঠামো নবাবী আমলের স্থাপত্য ক্ষমতার সাক্ষ্য দেয়।

ধর্মীয় অবস্থা: ফুটি মসজিদে বর্তমানে নিয়মিত সালাত আদায় হয় না। এটি কার্যকর মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত না হয়ে মূলত একটি ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। তবুও মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে এটি গভীর সম্মানের সঙ্গে বিবেচিত।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ফুটি মসজিদ শুধু একটি অসম্পূর্ণ স্থাপনা নয়; বরং এটি বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতার এক জীবন্ত দলিল। নবাব সরফরাজ খানের পতন ও আলিবর্দী খানের উত্থানের ইতিহাস এই মসজিদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও পরিকল্পনাও থমকে যেতে পারে।

উপসংহার: ফুটি মসজিদ মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে এক করুণ কিন্তু গৌরবময় অধ্যায়। অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও এটি বাংলার মুসলিম স্থাপত্য ও নবাবী ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে ফুটি মসজিদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এক জীবন্ত পাঠ হয়ে থাকতে পারে। মসজিদ যেহেতু আল্লাহর ঘর, কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, আমাদের করণীয় ছিল মসজিদটি নির্মাণ, হেফাজত ও আবাদ করা, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার নিজের দায়িত্ব পালনের অক্ষম হয়েছি। আমাদের করণীয় হবে পৃথিবীর সকল মসজিদ হেফাজত ও আবাদ করা। হে আল্লাহ আমাদের রব! তুমি আমাদের তৌফিক দাও। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

ভারত বর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের অবদান। আব্দুর রাকিব নাদভী

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভূমিকা।

বাংলা ভাষায় ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব।