মানুষের জীবনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর পবিত্র সিরাতের প্রভাব।

মানুষের জীবনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর পবিত্র সিরাতের প্রভাব।
 মাওলানা ফজলুল্লাহ আনসারী সালাফী
সম্পাদক: জেলা জমিয়তে আহলে হাদীস মধুবানী বিহার।
অনুবাদক: আব্দুর রাকিব নাদভী, সহ সভাপতি জেলা জমিয়তে আহলে হাদীস উত্তর দিনাজপুর।

আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্পর্কে পবিত্র আল কুরআনে অনেক গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে। যেমন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: 
 إِنّا أَرسَلنٰكَ بِالحَقِّ بَشيرًا وَنَذيرًا ۖ وَلا تُسـَٔلُ عَن أَصحٰبِ الجَحيمِ

অর্থ : নিশ্চয় আমি আপনাকে সত্যধর্মসহ সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে পাঠিয়েছি। আপনি দোযখবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন না। (সুরা বাকারা আয়াত নং ১১৯)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরো বলেন: 

 إِنّا أَرسَلنٰكَ شٰهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذيرًا لِتُؤمِنوا بِاللَّهِ وَرَسولِهِ وَتُعَزِّروهُ وَتُوَقِّروهُ وَتُسَبِّحوهُ بُكرَةً وَأَصيلًا
অর্থ : আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি অবস্থা ব্যক্তকারীরূপে, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে। যাতে তোমরা আল্লাহ ও রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তাঁকে সাহায্য ও সম্মান কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর। (সুরা ফাতাহ আয়াত নং ৮-৯)
বিশ্ব নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। এই মর্মে আম্মা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু কে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি রাযিয়াল্লাহা বলেন: 
كان خلقه القرآن 

অর্থ: বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর চরিত্র ছিল পবিত্র আল কোরানের ন্যায়। (

বিশ্ব সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্বয়ং বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চরিত্র সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করেন: 
 وَإِنَّكَ لَعَلىٰ خُلُقٍ عَظيمٍ

আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী। (সুরা কলম আয়াত নং ৪)

একজন মানুষ তখনই অন্যকে প্রভাবিত করে যখন তার জীবন সমস্ত গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য দ্বারা পরিপূর্ণ। বিশ্ব সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সবদিক থেকে পরিপূর্ণ করে মানবের হেদায়েতের জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ করেছিলেন। এই মর্মে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন:

اليَومَ أَكمَلتُ لَكُم دينَكُم وَأَتمَمتُ عَلَيكُم نِعمَتى وَرَضيتُ لَكُمُ الإِسلٰمَ دينًا ۚ 

অর্থ: আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। (সুরা মায়েদা আয়াত নং ৩)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াতের পূর্বে হেরা গুহায় আল্লাহর এবাদতে মগ্ন থেকে নিজের আত্মাকে পবিত্র করার পর যখন নবুয়াতের দায়িত্ব পেলেন। এই দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথে তিনি পৃথিবীর ভূখণ্ডে একটি বিপ্লব নিয়ে আসতে সক্ষম হয়ে উঠলেন। আরব থেকে উঠা নবুয়াতের ওই ধ্বনি পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

মানুষের আকীদার সংস্কার: 
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়াতের সময়কালীন আরব ভূখণ্ডে লোকেরা দাবি করত যে তারা তাদের আদি পিতা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এর আনা ধর্মের অনুসারী, কিন্তু সত্যিকারে তারা ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের নিয়ে আসা ধর্ম থেকে অনেক অনেক দূরে ছিল। সময়ের সাথে সাথে তাদের আকিদা, আচার আচরণ একেবারে পরিবর্তন হয়ে যায়, এমনকি  ইব্রাহিম আলাইহিস্ সালামের শিক্ষার কোন ছাপ ও চিহ্ন তাদের জীবনে বাকি ছিল না। 
ইহুদি ধর্মের অবস্থা ছিল খুব দুঃখজনক, এমনকি
 ইহুদি ধর্ম গুরুরা তাদের ধর্মকে পরিবর্তন করে, তারা নিজেদেরকে প্রভু বলে প্রকাশ করে। এছাড়া খ্রিস্টান ধর্মের অবস্থা ছিল ওই একই রকম। এই মর্মে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: 

وَقالَتِ اليَهودُ عُزَيرٌ ابنُ اللَّهِ وَقالَتِ النَّصٰرَى المَسيحُ ابنُ اللَّهِ ۖ ذٰلِكَ قَولُهُم بِأَفوٰهِهِم ۖ يُضٰهِـٔونَ قَولَ الَّذينَ كَفَروا مِن قَبلُ ۚ قٰتَلَهُمُ اللَّهُ ۚ أَنّىٰ يُؤفَكونَ، اتَّخَذوا أَحبارَهُم وَرُهبٰنَهُم أَربابًا مِن دونِ اللَّهِ وَالمَسيحَ ابنَ مَريَمَ وَما أُمِروا إِلّا لِيَعبُدوا إِلٰهًا وٰحِدًا ۖ لا إِلٰهَ إِلّا هُوَ ۚ سُبحٰنَهُ عَمّا يُشرِكونَ

অর্থ :ইহুদীরা বলে ওযাইর আল্লাহর পুত্র এবং নাসারারা বলে ‘মসীহ আল্লাহর পুত্র’। এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা। এরা পূর্ববর্তী কাফেরদের মত কথা বলে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টা পথে চলে যাচ্ছে। তারা তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদিগকে তাদের পালনকর্তারূপে গ্রহণ করেছে আল্লাহ ব্যতীত এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মাবুদের এবাদতের জন্য। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তারা তাঁর শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পবিত্র। (সুরা তওবা আয়াত নং ৩০-৩১)
আরবদের মাঝে নানা কুসংস্কার থাকা সত্ত্বেও তখনকার ইহুদি অথবা খ্রিস্টান ধর্ম কোনো রকম আরবদের প্রতি প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়নি। 

عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِيِّ، أَنَّهُ قَالَ صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَلاَةَ الصُّبْحِ بِالْحُدَيْبِيَةِ عَلَى إِثْرِ سَمَاءٍ كَانَتْ مِنَ اللَّيْلَةِ، فَلَمَّا انْصَرَفَ أَقْبَلَ عَلَى النَّاسِ فَقَالَ ‏"‏ هَلْ تَدْرُونَ مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ ‏"‏‏.‏ قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ‏.‏ قَالَ ‏"‏ أَصْبَحَ مِنْ عِبَادِي مُؤْمِنٌ بِي وَكَافِرٌ، فَأَمَّا مَنْ قَالَ مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ فَذَلِكَ مُؤْمِنٌ بِي وَكَافِرٌ بِالْكَوْكَبِ، وَأَمَّا مَنْ قَالَ بِنَوْءِ كَذَا وَكَذَا فَذَلِكَ كَافِرٌ بِي وَمُؤْمِنٌ بِالْكَوْكَبِ ‏"‏‏.‏

যায়দ ইব্‌নু খালিদ জুহানী (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাতে বৃষ্টি হবার পর হুদায়বিয়াতে আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে ফিরে বললেনঃ তোমরা কি জান, তোমাদের পরাক্রমশালী ও মহিমাময় প্রতিপালক কি বলেছেন? তাঁরা বললেনঃ আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূলই বেশি জানেন। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ (রব) বলেন, আমার বান্দাদের মধ্য কেউ আমার প্রতি মু’মিন হয়ে গেল এবং কেউ কাফির। যে বলেছে, আল্লাহ্‌র করুনা ও রহমতে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে হল আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি অবিশ্বাসী। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী হয়েছে এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী হয়েছে। (সহীহ আল বুখারী, হাদিস নং ৮৪৬)

এমতাবস্থায় যখন সারা বিশ্ব, বিশেষ করে ইহুদী-খ্রিস্টান সহ  আরব ভূখণ্ড ও অন্যান্যরা বিশ্ব সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তারা ছিল ভুল ধারণার উপর। সূরা ইখলাসের মাধ্যমে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সামনে বিশ্ব সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সঠিক পরিচয় তুলে ধরলেন। এবং  ঘোষণা করলেন: তিনি (আল্লাহ ) এক ও অদ্বিতীয়,  তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, তিনি পিতৃহীন ও তিনার কোন সন্তান নেই এবং কেউ তিনার সমতুল্য নন। 

قُل هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ، اللَّهُ الصَّمَدُ، لم يَلِد وَلَم يولَد، وَلَم يَكُن لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ

(হে নবী!) আপনি বলুন, তিনি আল্লাহ, এক, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার সমতুল্য কেউ নেই। (সুরা ইখলাস আয়াত নং ১-৪)

এক কথায় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সময়ে পরিচালিত ভ্রান্ত আকিদা ও বিশ্বাসকে খন্ডন করে পৃথিবীবাসীর সামনে সঠিক আকিদা তুলে ধরলেন, এবং উচ্চ সুরে ঘোষনা করলেন যে, হে পৃথিবীর মানুষ!  তোমরা তোমাদের আকিদা শুদ্ধ করে নাও, তোমরা ভ্রান্ত আকিদা ও ধারণার উপর নিমজ্জিত আছো। মনে রাখো , আমাদের সৃষ্টিকর্তা এক, তিনি স্বাধীন, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, তিনি পিতৃহীন, তিনার কোন সন্তান নেই এবং  কেউ তার সমতুল্য নেই।
এটি হচ্ছে আকিদার মধ্যে বিপ্লব, বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীর বুকে মানুষের আকিদার মধ্যে বিপ্লব আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সামাজিক সংস্কার: 
বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুওয়াতের পূর্বে মানব জাতি শুধু কু-বিশ্বাস ও ভ্রান্ত আকিদায় লিপ্ত ছিল না, বরং তাদের সামাজিক জীবনও ছিল খুব সচনীয় ও দুঃখজনক। তারা নানাবিধ অন্যায়-অপকর্মে লিপ্ত থাকতো। মদ, জুয়া, ব্যভিচার, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই, অন্যায় ও অত্যাচার সুদ ঘুষ, ঘৃণা, হিংসা এবং ফিতনা -ফাসাদ ও হত্যা ও রক্তপাত, কন্যা সন্তান কে জীবিত অবস্থায় দাফন ইত্যাদি এক কথায় সকল প্রকার অপরাধে তারা নিমজ্জিত ছিল। মদ সম্পর্কে হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্বয়ং বর্ণনা করেন: 
عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ كُنْتُ سَاقِيَ الْقَوْمِ فِي مَنْزِلِ أَبِي طَلْحَةَ، وَكَانَ خَمْرُهُمْ يَوْمَئِذٍ الْفَضِيخَ، فَأَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُنَادِيًا يُنَادِي ‏"‏ أَلاَ إِنَّ الْخَمْرَ قَدْ حُرِّمَتْ ‏"‏‏.‏ قَالَ فَقَالَ لِي أَبُو طَلْحَةَ اخْرُجْ فَأَهْرِقْهَا، فَخَرَجْتُ فَهَرَقْتُهَا، فَجَرَتْ فِي سِكَكِ الْمَدِينَةِ فَقَالَ بَعْضُ الْقَوْمِ قَدْ قُتِلَ قَوْمٌ وَهْىَ فِي بُطُونِهِمْ‏.‏ فَأَنْزَلَ اللَّهُ ‏{‏لَيْسَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جُنَاحٌ فِيمَا طَعِمُوا‏}‏ الآيَةَ‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, একদিন আমি আবূ তালহার বাড়িতে লোকজনকে শরাব পান করাচ্ছিলাম। সে সময় লোকেরা ফাযীখ শরাব ব্যবহার করতেন। রসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তিকে আদেশ করলেন, যেন সে এই মর্মে ঘোষনা দেয় যে, সাবধান! শরাব এখন হতে হারাম করে দেয়া হয়েছে। আবূ তালহা (রাঃ) আমাকে বললেন, বাহিরে যাও এবং সমস্ত শরাব ঢেলে দাও। আমি বাইরে গেলাম এবং সমস্ত শরাব রাস্তায় ঢেলে দিলাম। আনাস (রাঃ) বলেন, সে দিন মদীনার অলিগলিতে শরাবের প্লাবন বয়ে গিয়েছিল। তখন কেউ কেউ বলল, একদল লোক নিহত হয়েছে, তথচ যাদের পেটে শরাব ছিল। তখন এই আয়াত নাযিল হল : “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারা পূর্বে যা কিছু পানাহার করেছে তার জন্য তাদের কোন গুনাহ হবে না” – (আল-মা-য়িদাহ ৯৩)। (সহীহ আল বুখারী, হাদিস নং ২৪৬৪)
আরবদের সামাজিক অবস্থা এত নিম্নস্তরে পৌঁছে গিয়েছিল যে, তারা নিজের গর্ভে ভূমিষ্ঠ কন্যা সন্তানকে নিজের হাতে জীবিত অবস্থায় দাফন করতে কোন দ্বিধা বোধ করত না। তাদের এই কুপ্রথা ও নোংরা অবস্থাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র আল কুরআনে বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
 وَإِذا بُشِّرَ أَحَدُهُم بِالأُنثىٰ ظَلَّ وَجهُهُ مُسوَدًّا وَهُوَ كَظيمٌ ، يَتَوٰرىٰ مِنَ القَومِ مِن سوءِ ما بُشِّرَ بِهِ ۚ أَيُمسِكُهُ عَلىٰ هونٍ أَم يَدُسُّهُ فِى التُّرابِ ۗ أَلا ساءَ ما يَحكُمونَ

অর্থ : যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তারা মুখ কাল হয়ে যায় এবং অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে থাকে। সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে থাকতে দেবে, না তাকে মাটির নীচে পুতে ফেলবে। শুনে রাখ, তাদের ফয়সালা খুবই নিকৃষ্ট। (সুরা নাহল আয়াত নং ৫৮-৫৯)


 রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন:
আরব সমাজ একাধিক গোত্রে বিভক্ত ছিল, তাদের প্রত্যেকের ছিল নিজস্ব ঐতিহ্য, প্রথা, রীতিনীতি ও পরিচয়। আর এটিকে ধরে ও  টিকিয়ে রাখার জন্য তারা রক্তপাত থেকে দ্বিধাবোধ করেনি এমনকি শতাব্দী ধরে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। উধারনস্বরূপ: আউস ও খাজরাজ গোত্রের যুদ্ধ, এই যুদ্ধ মানব সমাজকে হতবাক ও বিস্মিত করে যে, কেমনে মানুষ নিজেদের মধ্যে এত রক্তপিপাসু হতে পারে? 
 কিন্তু ইসলামী শিক্ষার ফলে তারা পরস্পর শত্রুতা ভুলে গিয়ে একে অপরের বন্ধু, সহযোগি এমনকি একটি সীসা প্রাচীরে পরিণত হয়েছিল।
অর্থনৈতিক দিক থেকে একই অবস্থা ছিল তাদের। 
দরিদ্র লোকেরা পুঁজিপতি ও ধ্বনি লোকদের কাছে শোষিত ছিল। এই সচনীয় পরিস্থিতিতে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত বাণী দ্বারা তাদের কে সতর্ক করলেন:

 الَّذينَ يُنفِقونَ أَموٰلَهُم بِالَّيلِ وَالنَّهارِ سِرًّا وَعَلانِيَةً فَلَهُم أَجرُهُم عِندَ رَبِّهِم وَلا خَوفٌ عَلَيهِم وَلا هُم يَحزَنونَ ، الَّذينَ يَأكُلونَ الرِّبوٰا۟ لا يَقومونَ إِلّا كَما يَقومُ الَّذى يَتَخَبَّطُهُ الشَّيطٰنُ مِنَ المَسِّ ۚ ذٰلِكَ بِأَنَّهُم قالوا إِنَّمَا البَيعُ مِثلُ الرِّبوٰا۟ ۗ وَأَحَلَّ اللَّهُ البَيعَ وَحَرَّمَ الرِّبوٰا۟ ۚ فَمَن جاءَهُ مَوعِظَةٌ مِن رَبِّهِ فَانتَهىٰ فَلَهُ ما سَلَفَ وَأَمرُهُ إِلَى اللَّهِ ۖ وَمَن عادَ فَأُولٰئِكَ أَصحٰبُ النّارِ ۖ هُم فيها خٰلِدونَ
অর্থ: যারা স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে, রাত্রে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে। তাদের জন্যে তাদের সওয়াব রয়েছে তাদের পালনকর্তার কাছে। তাদের কোন আশংঙ্কা নেই এবং তারা চিন্তিত ও হবে না।
যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়। তাদের এ অবস্থার কারণ এই যে, তারা বলেছেঃ ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লা’হ তা’আলা ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন। অতঃপর যার কাছে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, পূর্বে যা হয়ে গেছে, তা তার। তার ব্যাপার আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আর যারা পুনরায় সুদ নেয়, তারাই দোযখে যাবে। তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। (সুরা বাকারা আয়াত নং ২৭৪-২৭৫)
এর ফলে তাদের অর্থনীতি পরিবেশ পরিবর্তন ঘটে এবং অর্থনৈতির পরিকাঠামো ও নীতিমালায় ভারসাম্য আসে। অর্থনীতি দিক দিয়ে নিপীড়ন জনগণ পুঁজিপতি ও ধ্বনি লোকদের শোষিত থেকে মুক্তি পায়। এবং সুখী জীবন গড়তে সক্ষম হয়ে উঠে।


 



নারী, শিশু বিশেষ করে সমাজের নির্যাতিত মানুষের প্রতি বিপ্লব:
ইসলাম সমাজে বসবাসকারী সকল ব্যক্তির  অধিকার সংরক্ষণ করেছে। বিশেষ করে মহিলা শিশু এবং সমাজের নির্যাতিত মানুষদের অধিকার রক্ষায় ইসলাম বিশেষ ভূমিকা পালন করে, এবং উচ্চ স্বরে বলে হে পৃথিবীর মানুষ পিতা-মাতার সেবা হচ্ছে জিহাদ, তোমরা স্ত্রীর সাথে সদ্ব্যবহার কর, সন্তান হচ্ছে মূল্যবান সম্পদ, দাস দাসী দের সাথে সদ্ব্যবহার কর। একদা হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) তার দাসকে তার মায়ের ব্যাপারে তিরস্কার করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গিফারী (রা:) কে ধমক দিয়ে বলেন:  
 হে আবু যর! তোমার মধ্যে জাহিলিয়াতের কর্ম কান্ড এখনো দেখা যাচ্ছে। 
عَنِ الْمَعْرُورِ بْنِ سُوَيْدٍ، قَالَ مَرَرْنَا بِأَبِي ذَرٍّ بِالرَّبَذَةِ وَعَلَيْهِ بُرْدٌ وَعَلَى غُلاَمِهِ مِثْلُهُ فَقُلْنَا يَا أَبَا ذَرٍّ لَوْ جَمَعْتَ بَيْنَهُمَا كَانَتْ حُلَّةً ‏.‏ فَقَالَ إِنَّهُ كَانَ بَيْنِي وَبَيْنَ رَجُلٍ مِنْ إِخْوَانِي كَلاَمٌ وَكَانَتْ أَمُّهُ أَعْجَمِيَّةً فَعَيَّرْتُهُ بِأُمِّهِ فَشَكَانِي إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَلَقِيتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏"‏ يَا أَبَا ذَرٍّ إِنَّكَ امْرُؤٌ فِيكَ جَاهِلِيَّةٌ ‏"‏ ‏.‏ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ سَبَّ الرِّجَالَ سَبُّوا أَبَاهُ وَأُمُّهُ ‏.‏ قَالَ ‏"‏ يَا أَبَا ذَرٍّ إِنَّكَ امْرُؤٌ فِيكَ جَاهِلِيَّةٌ هُمْ إِخْوَانُكُمْ جَعَلَهُمُ اللَّهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ فَأَطْعِمُوهُمْ مِمَّا تَأْكُلُونَ وَأَلْبِسُوهُمْ مِمَّا تَلْبَسُونَ وَلاَ تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ فَأَعِينُوهُمْ ‏"‏ ‏.‏
মা’রূর ইবনু সুওয়াইদ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, আমরা রাবাযাহ নামক স্থানে আবূ যর (রাযিঃ) এর নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন তার গায়ে একটি চাদর ছিল এবং তার গোলামের গায়েও অনুরূপ একটি চাদর ছিল। তখন আমরা বললাম, হে আবূ যার (রাযিঃ)! যদি আপনি উভয়টি একত্রিত করতেন, তাহলে এক জোড়া চাদর হতো। তিনি বললেন, আমার মধ্যে এবং আমার ভাই সম্পৰ্কীয় ব্যক্তিটির মধ্যে কিছু কথা আছে। তার মা একজন অনারব। একদা আমি তার মাকে উল্লেখ করে তাকে ভৎসনা করলাম। তখন সে আমার বিরুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নালিশ করল। এরপর যখন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম তখন তিনি বললেন, হে আবূ যার! তুমি এমন ব্যক্তি, যার মধ্যে জাহিলী যুগের কাজকর্ম রয়েছে (যে সময়ে একে অন্যের বাপ-মাকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছজান করতো)।

আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! যে ব্যক্তি মানুষদেরকে গালি দেয় তার প্রতি উত্তরে তারাও তার পিতা মাতাকে উল্লেখ করে গালি দেয়া স্বাভাবিক। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:  হে আবূ যার! তোমার মধ্যে জাহিলী যুগের কর্মকাণ্ড এখনও বিদ্যমান (অর্থাৎ তার মন্দ কথার বদলায় তার বাবা-মাকে গালি দেয়া অন্যায়)। তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তা খাওয়াবে এবং তোমরা যেমন পোশাক পরবে তাদেরকে তা পরাবে। তোমরা তাদের উপর এমন কোন কাজের ভার চাপিয়ে দিবে না, যা করতে তারা হিমশিম খেয়ে যায়। যদি তোমরা তাদেরকে কোন কাজে কষ্ট দাও, তাহলে এ কাজে তাদের সাহায্যও করো। (সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৪২০৫)
দোয়া: হে আমাদের রব! তুমি আমাদের তৌফিক দাও আমরা যেন প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতকে জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তে বাস্তবায়ন করতে পারি। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

ভারত বর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের অবদান। আব্দুর রাকিব নাদভী

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভূমিকা।

বাংলা ভাষায় ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব।