জামিয়াতুল হোদা আল-ইসলামিয়া পশ্চিমবঙ্গের একটি আদর্শবান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

 জামিয়াতুল হোদা আল-ইসলামিয়া পশ্চিমবঙ্গের একটি আদর্শবান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।





প্রতিষ্ঠান পরিচিতি

পশ্চিমবাংলার রাজধানী কোলকাতা পুরাতন বাণিজ্যিক শহর। এর পার্শ্ববর্তী চারটি জেলা হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ মুসলিম আবাদী। কিন্তু এখানকার লোকেরা আর্থিকভাবে দুর্বল এবং শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। এই দুরবস্থা দেখে মাওলানা জাকি আহমদ মাদানী সাহেব ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগিবৃন্দ শিক্ষা ও সমাজ কল্যাণ মূলক কাজের জন্য "কোলকাতা আলহুদা এডুকেশন্যাল এ্যান্ড ওয়েলফেয়ার সোসাইটিনামে একটি সোসাইটি ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। সোসাইটি প্রথম দিন থেকেই নিজ লক্ষ্য অর্জনে সক্রিয়। এবং শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে মূল্যবান সেবা প্রদান করে সমাজে স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সোসাইটি তার মিশনকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছে, যার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা ও বর্ণনা নিম্নে দেওয়া হল:

জামিয়াতুল হোদা আল-ইসলামিয়া

 মুসলিমদের মধ্যে শিক্ষা ও শিক্ষাসচেতনতা গড়ে তোলার জন্য একটি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা যাবত দশ বৎসর পর্যন্ত 'মাহাদুল হুদা আল ইসলামি' নামে চলছিল। অতঃপর কার্যকরী কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে তার নাম পরিবর্তন করে, নামকরণ করা হয়  জামেয়াতুল হুদা আল ইসলামিয়া।

 

জামেয়া প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য

জামেয়া প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হল আল্লার বান্দাদেরকে তার এবাদতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা এবং জীবন যাপনের সঠিক পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া। মিল্লাতের ছেলে-মেয়েদেরকে ধর্মহীনতা, পথভ্রষ্টতা ও কুসংস্কার থেকে ফিরিয়ে সঠিক ইসলামি শিক্ষা ও দুনিয়াবী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। নতুন ও পুরাতন আরবী সাহিত্য শিক্ষা দেওয়া।

জামেয়ার একটি কার্যকরী কমিটি আছে। প্রয়োজন মতো তার মিটিং হয় এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিন দিন জামেয়া উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আল্ হামদু লিল্লাহ

 জামেয়ার শিক্ষার শ্রেণীবিন্যাস

জামেয়ায় শিক্ষাকে চারটি স্তরে বিভাজন করা হয়েছে।

(১) প্রথমস্তর: মুতা অস্বেতা (Middle School) সময় সীমা দুই বছর।

 (২)দ্বিতীয়স্তর: সানুবিয়্যা (Secondary School) এ স্তরে সময় সীমা দুই বছর।

(৩) তৃতীয়স্তর: আলেমিয়াতসময় সীমা দুই বছর।

(৪) চতুর্থ স্তর: ফাজিলাত। এ স্তরে সময় সীমা দুই বছর।

জামেয়ার পাঠ্যক্রম।

জামেয়ার পাঠ্যক্রমে পবিত্র আল-কোরআন  ও সুন্নাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছেএর সঙ্গে কিতাব ও সুন্নাত সহায়ীকা অন্যান্য বিষয় সমূহকেও পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন- আল - কোরান হিফজ (আল কোরআন মুখস্থ করা), তাজবীদ ( সঠিক উচ্চারণ সহ আল কোরআন পাঠ করা) , আকিদা (ধর্ম বিশ্বাস), আরবী ব্যাকরণ ও সাহিত্য, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনী, ইতিহাস, ছন্দপ্রকরণ, বিবিধ ধর্ম ও গোষ্ঠী, হাদীস বিশারদ ও  বিশেষজ্ঞদের জীবনী, ধর্মের প্রতি দাওয়াতের নিয়মাবলী। এর সাথে সাথে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, অংক, বিজ্ঞান, ভূগোল, বাংলা সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিদ্যালয়ে ছাত্র ছাত্রীদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য আলাদা ভাবে কোচিং এর ব্যবস্থা আছে যাতে, তাঁরা আলেম হওয়ার সাথে সাথে ধর্মীয় বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার ক্ষেত্রে ফাজিল কোর্স অথবা যদি সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আই  এ এস (IAS) ও আই পি এস (IPS) অফিসার হতে চাই, তবে যেন আধুনিক বিদ্যালয়ে সহজেই ভর্তি হতে পারে।

জামেয়াকে মান্যতা

আলহামদুলিল্লাহ সৌদি আরবের বিশ্ব বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় ১৪৩৬ হিজরী মোতাবেক ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে আমাদের প্রিয় বিদ্যালয় " জামেয়াতুল হোদা আল ইসলামিয়া " কে মান্যতা দিয়েছে। ফলে, যারা জামিয়া থেকে " আলিমিয়াত"  কোর্স পাশ করবে , তাঁরা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় মদিনায় উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাবে ইন শা আল্লাহ

মাহাদ জায়েদ বিন সাবেত লে তাহফিজুল কুরআন আল কারিম

 যেহেতু কুরআনের শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।  এ শিক্ষা হচ্ছে সকল শিক্ষা থেকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। তাই পবিত্র আল কোরআনকে অগ্রাধিকার দিয়ে কোরআন হেফজ ( মুখস্ত ) করার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

  যেখানে প্রায় আশি থেকে অধিক ছাত্র, ছয়জন তাযবিদ ও কেরাতের স্পেসালিস্ট ক্বারী ও হাফেজ এর তত্ত্বাবধানে সঠিক মাখারিজসহ ( উচ্চারণসহ) পবিত্র আল-কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়। এবং এর সঙ্গে কে.জি. থেকে দশম শ্রেণীর সিলেবাসের অংশ বিশেষ পড়ানো হয়, যাতে শিক্ষার্থীরা পবিত্র আল-কোরআন মুখস্ত করার সাথে সাথে নিজেকে মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত ও যোগ্য করে তুলতে পারে। এবং সহজেই সাধারণ ও আরবী বিভাগে ভর্তি হতে পারে।

এছাড়াও মাহাদ আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ, মাহাদ উমর বিন খাত্তাব, এবং মাদ্রাসাতুল হুদা নামে পৃথক ভাবে তিনটি প্রতিষ্ঠান চলছে। এবং পবিত্র আল-কোরআন  ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।

মার্কায আদ্ দাওয়া অল ইফতা

সমাজকে বিদ্আত ও কুসংস্কার মুক্ত এবং নিখুঁত ইসলামি আকিদার প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে "মার্কায আদ্ দাওয়া অ ইফতা" নামে একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। একজন মুখ্যপরিচালক, কয়েকজন সদস্য নিয়ে যার একটি বিশেষ কমিটি আছে। যাদের তত্ত্বাবধানে নিকটবর্তী এলাকায় সপ্তাহিক আল কুরআনের দারস, জুমার খুতবা,মাসিক আলোচনা সভা, ধর্মীয় জালসা ও বিশেষ সম্মেলন ইত্যাদি দাওয়াতী কাজকর্ম সক্রিয়তার সহিত করা হয়। এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ধর্মীয় বিষয়ে প্রশ্নাদির উত্তর পবিত্র আল-কোরআন ও সহীহ, বিশুদ্ধ হাদীসসমূহের আলোকে লিখিত এবং বক্তব্য উভয় আকারে দেয়া হয়।

আঞ্জুমান নাদি উত্ তলাবা।

বক্তব্য পরিবেশন, বিষয়ভিত্তিক লেখনী এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি ইসলামি দাওয়াতের একটি অন্যতম এবং গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং আধুনিক যুগের বড় অস্ত্র।

অতএব শিক্ষার্থীদেরকে উক্ত বিষয়গুলিতে পারদর্শী করে গড়ে তোলার জন্য " আঞ্জুমান নাদি উত্ তলাবা"  নামক ছাত্র সংগঠন গড়া হয়েছে। যার অধীনস্থে আরবী, উর্দু, ইংরেজি ও বাংলা চারটি ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার অভ্যাস,এবং লেখনি শক্তি বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এবং " সাওতুল হাদী " নামে  আরবি, উর্দু, ইংরেজি তিনটি ভাষার মাসিক দেওয়াল পত্রিকা ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়। এছাড়া এর অধীনে পাক্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেমন:  হামদ ও নাত পরিবেশন, বিষয় ভিত্তিক ডেবিট, রিপোর্টিং, হেফজে মুতূন কম্পিটিশন ইত্যাদি আয়োজন করা হয়। এর অধীনে প্রত্যেক বছর বাৎসরিক পুরস্কার প্রতিযোগিতা আরবি, উর্দু, ইংরেজি, বাংলা, হিন্দি একাধিক ভাষায় এবং একাধিক বিষয়ে আয়োজন করা হয়। অধিকাংশ শিক্ষার্থী উক্ত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। এবং তাঁদের মধ্যে পুরস্কার এবং সার্টিফিকেট বিতরণ করা হয়। এই আঞ্জুমানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ছাত্রদের মধ্যে লেখনী শক্তিকে বৃদ্ধি ও বিকাশিত করার জন্য মাসিক ওয়াল পত্রিকা উর্দু এবং আরবি ভাষায় প্রকাশিত করার সাথে সাথে বাৎসরিক ছাত্র পত্রিকা "সাওতুল হাদী " নামে প্রকাশিত করা হয়।

ইমাম ইবনে বাজ সেন্ট্রাল লাইব্রেরী

প্রতিটি জাতির জন্য গ্রন্থাগারের গুরুত্ব অপরিসীম। গ্রন্থাগার জ্ঞান ও গবেষণার ক্ষেত্রে প্রাণকেন্দ্র। গ্রন্থাগারের গুরুত্ব সামনে রেখেই " ইমাম ইবনে বাজ সেন্ট্রাল লাইব্রেরী" নামক গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেখানে প্রতিটি বিষয়ে রেফারেন্স পুস্তক যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। এছাড়া তাফসির, উসুলে তাফসির, হাদীস,  উসুলে হাদীস, ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ, সীরাত, সাহিত্য  ইত্যাদি বিষয়ে পুস্তকের ভান্ডার আছে গ্রন্থগারের পুস্তক দ্বারা শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষার্থী উভয়েই উপকৃত হচ্ছেন। গ্রন্থগারকে আরো উন্নত ও বড় করার প্রয়াস ও চেষ্টা চলছে।

ডিবেট বা বিতর্ক প্রতিযোগীতা

সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করার জন্য তর্ক-বিতর্ক বা ডিবেট প্রতিযোগিতার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। তর্ক সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা প্রমাণিত করেমুসলিমদের করণীয় সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা প্রমাণিত করা। এই কাজ তখনই সম্ভব, যখন মানুষের মধ্যে সত্যের সন্ধান এবং বিতর্কে দক্ষতা থাকবেতাই বিতর্কের গুরুত্বকে সামনে রেখে ছাত্রদের মাঝে সময় সময়ে বিষয় ভিত্তিক ডিবেট বা বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। যাতে করে ছাত্রদের মধ্যে ডিবেট বা বিতর্কে দক্ষতা বিকাশিত হয়।

ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার

আজ আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তাঁরা নিজ ধর্মের মৌলিক ও অপরিহার্য শিক্ষা সম্পর্কেও জ্ঞাত নয়। কারণ যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁরা শিক্ষা অর্জন করছে, সেখানে ধর্মীয় শিক্ষার অভাব রয়েছে।এই ধরণের শিক্ষার্থীদেরকে ধর্মের মৌলিক ও অপরিহার্য বিষয়গুলো শিক্ষা প্রদান করার উদ্দেশ্যে পৃথক ভাবে একটি শাখা " ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার " নামে ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই কোর্সের সময়সীমা দুই বছর। এই কোর্সটি বিশেষ করে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও অন্যান্য আধুনিক কোর্সের সাথে জড়িত সকল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে  উপস্থাপন করা হয়েছে এই কোর্সের মাধ্যমে ইন শা আল্লাহ শিক্ষার্থীরা ইসলামের মৌলিক ও অপরিহার্য বিষয়গুলো সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করার সাথে সাথে আরবি ভাষা সম্পর্কেও প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হবে। এবং আশা করি এই কোর্সটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে চাকরি বা উচ্চশিক্ষার পথ সহজ করতে সাহায্য করবে, ইন শা আল্লাহ।  বর্তমানে এই কোর্সটি চারটি স্তরে চলছে আলহামদুলিল্লাহ এবং শিক্ষার্থীদের একটি যথেষ্ট পরিমাণ সংখ্যা এই কোর্স থেকে উপকৃত হচ্ছে।

আল হুদা রিসার্চ এন্ড পাবলিকেশন

ইসলামিক স্কলার্স, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের দ্বারা বইয়ের সংকলন ও গবেষণা এবং বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ, অন্যতম ও প্রয়োজনীয় বিষয়। এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাকে লক্ষ্য করে " আল হুদা রিসার্চ এন্ড পাবলিকেশন (আল হুদা পাবলিকেশন এবং গবেষণা কেন্দ্র) নামে একটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়। আলহামদুলিল্লাহ, সেন্টারের অধীনে এ পর্যন্ত ৪৩টি শিক্ষামূলক বই ছাপা হয়েছে। এবং ত্রৈমাসিক আল-হাদি ম্যাগজিন ২০২১ সাল থেকে ধারাবাহিক এই সেন্টারের অধীনেই প্রকাশিত হচ্ছে।

 

Comments

Popular posts from this blog

ভারত বর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের অবদান। আব্দুর রাকিব নাদভী

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভূমিকা।

বাংলা ভাষায় ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব।