গালি এক ধরনের বড় অপরাধ।

 গালি এক ধরনের বড় অপরাধ।

 আব্দুর রাকিব নাদভী



গালি যাকে আমরা কথ্য ভাষায় গাইল বলে থাকি। এর অভিধানিক অর্থ হচ্ছে: তিরষ্কার ,কুত্সিত , অশ্লীল, কটু ও নোংরা কথা বলা। গালি যে ধরনেরই বা যে ভাষায়ই হোক না কেন সেটি এক ধরনের অপরাধ এবং পাপের কাজ। মুসলিম উম্মার করণীয় নিজেকে গালি থেকে মুক্ত এবং দূরে রাখা।

সাধারণত সমাজে  যে ঝগড়াঝাঁটি, বিবাদ- ফিতনা ও ফ্যাসাদ হয়, তার একাধিক কারণ সমূহের মধ্যে একটি বড় কারণ হচ্ছে গালি বা অশ্লীল ভাষার প্রয়োগ। বিতর্ক জড়িয়ে আমরা যখন হট করে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে ফেলি তখন  ঝগড়া আরম্ভ হয়ে যায়।

এবং লজ্জা জনক ব্যাপার মানুষ গালি দেওয়ার সময় গালির তীব্রতা বৃদ্ধির জন্য সাধারণ ভাষার পরিবর্তে যাকে গালি দিচ্ছে  তাঁর নিকটতম আত্মীয়-স্বজন যেমন: মাতা পিতা বা ভাই বোন ইত্যাদিকে টেনে অশালীন বা অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে।এবং পবিত্র সম্পর্কের পবিত্রতা লঙ্ঘন করার হয়। এবং এতে  মানুষ একটুও লজ্জা,শালীনতা বা কোন ধরণের দ্বিধা বোধ করে না।

অনেক সময় দেখে যায় মানুষ বিশেষ করে সহকর্মীরা পরস্পর গালাগালি করে, এবং হাঁসি মুখে তা মেনেও নেয়। এবং বলে ছাড় আমার বন্ধুই গালি দিয়েছে! অন্য কেউ গালি দিলে তাকে কঠোর ভাবে ধরতাম।  অথবা বলে আমরা কর্মক্ষেত্রে এক অপরকে গালি আদান প্রদান করি। এমনকি সমাজে কিছু নির্লজ্জ পিতা মাতা ও অভিভাবক অভিভাবিকা আছেন যারা নিজ সন্তান সন্তাদি ও আত্মীয়স্বজনদের মুখ থেকে গালি, অশ্লীল ভাষা এবং নোংরা কথাবার্তা শুনে তাঁরা মুচকি হেঁসে আনন্দ প্রকাশ করে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

সমাজে কিছু মানুষ এমনও মানুষ আছে গালি যাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে পড়েছে।যারা কথায় কথায় গালি ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে থাকে। আবার কিছু লোক গালিকে বর্তমান যুগের ফ্যাশন মনে করে।আর কিছু এমনও লোক আছে যারা আবেগে, অথবা রাগান্বিত অবস্থায় গালি ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করে থাকে।

এক কথায় গালি যেকোনো অবস্থায় অথবা যেকোনো মুহূর্তে হোক না কেন ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ ও হারাম। কোন মতেই গালি ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করা যাবে না।

কথোপকথনের পদ্ধতি ও বিধিবিধান সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং বলেন: 

يٰأَيُّهَا الَّذينَ ءامَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقولوا قَولًا سَديدًا

অর্থ: হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। ( সুরা আল আহযাব আয়াত নং ৭০)

وَإِذ أَخَذنا ميثٰقَ بَنى إِسرٰءيلَ لا تَعبُدونَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالوٰلِدَينِ إِحسانًا وَذِى القُربىٰ وَاليَتٰمىٰ وَالمَسٰكينِ وَقولوا لِلنّاسِ حُسنًا وَأَقيمُوا الصَّلوٰةَ وَءاتُوا الزَّكوٰةَ ثُمَّ تَوَلَّيتُم إِلّا قَليلًا مِنكُم وَأَنتُم مُعرِضونَ

অর্থ:  যখন আমি বনী-ইসরাঈলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারও উপাসনা করবে না, পিতা-মাতা, আত্নীয়-স্বজন, এতীম ও দীন-দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে, মানুষকে সৎ কথাবার্তা বলবে, নামায প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দেবে, তখন সামান্য কয়েকজন ছাড়া তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলে, তোমরাই অগ্রাহ্যকারী। (সুরা আল বাকারাহ আয়াত নং ৮৩)

এমন কি মিথ্যা দেবী দেবতা সম্পর্কেও কটুক্তি ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই মর্মে স্বয়ং মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: 

وَلا تَسُبُّوا الَّذينَ يَدعونَ مِن دونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدوًا بِغَيرِ عِلمٍ ۗ كَذٰلِكَ زَيَّنّا لِكُلِّ أُمَّةٍ عَمَلَهُم ثُمَّ إِلىٰ رَبِّهِم مَرجِعُهُم فَيُنَبِّئُهُم بِما كانوا يَعمَلونَ

অর্থ: তোমরা তাদেরকে মন্দ বলো না, যাদের তারা আরাধনা করে আল্লাহকে ছেড়ে। তাহলে তারা ধৃষ্টতা করে অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহকে মন্দ বলবে। এমনিভাবে আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে তাদের কাজ কর্ম সুশোভিত করে দিয়েছি। অতঃপর স্বীয় পালনকর্তার কাছে তাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন তিনি তাদেরকে বলে দেবেন যা কিছু তারা করত। ( সুরা আল আন'য়াম আয়াত নং ১০৮)

لا يُحِبُّ اللَّهُ الجَهرَ بِالسّوءِ مِنَ القَولِ إِلّا مَن ظُلِمَ ۚ وَكانَ اللَّهُ سَميعًا عَليمًا

অর্থ: আল্লাহ কোন মন্দ কথা প্রকাশ করা পছন্দ করেন না। তবে কারো প্রতি জুলুম হয়ে থাকলে সে কথা আলাদা। আল্লাহ শ্রবণকারী, বিজ্ঞ। ( সুরা আন্ নিসা আয়াত নং ১৪৮)

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: 

إِيَّاكُمْ والفُحْشَ والتَّفَحُّشَ ، فإنَّ اللهَ لا يحبُّ الفَاحِشَ والمتفحش

অশ্লীলতা থেকে সাবধান, কারণ আল্লাহ  অশ্লীলতা পছন্দ করেন না।( সহীহ আত তারগীব লিল আলবানী হাদীস নং ২৬০৩ ) 

عن عبد الله بن عمرو أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: أربع من كن فيه كان منافقا خالصا، ومن كانت فيه خصلة منهن كانت فيه خصلة من النفاق حتى يدعها إذا اؤتمن خان وإذا حدث كذب وإذا عاهد غدر، وإذا خاصم فجر

আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: 

চারটি স্বভাব যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সে খালিস মুনাফিক বলে গণ্য হবে। যে ব্যক্তি কথা বলার সময় মিথ্যা বলে, আর অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে, প্রতিশ্রুতি দিলে বিশ্বাসঘাতকতা করে, যখন ঝগড়া করে গালাগালি করে।  ( সহীহ আল বুখারী কিতাবুল ঈমান হাদিস নং ৩৪)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন: 

سباب المسلم فسوق، وقتاله كفر

অর্থ:  একজন মুসলিমকে গালি দেয়া পাপের কাজ এবং তার সাথে মারামারি করা কুফুরী। ( সহীহ আল বুখারী কিতাবুল আদাব হাদীস নং ৬০৪৪)

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏"‏ إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ أَنْ يَلْعَنَ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ ‏"‏‏.‏ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ يَلْعَنُ الرَّجُلُ وَالِدَيْهِ قَالَ ‏"‏ يَسُبُّ الرَّجُلُ أَبَا الرَّجُلِ، فَيَسُبُّ أَبَاهُ، وَيَسُبُّ أَمَّهُ ‏"‏‏

অর্থ: হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ নিজের পিতা-মাতাকে লানত করা। জিজ্ঞাসা করা হলঃ ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপন পিতা-মাতাকে কোন লোক কিভাবে লানত করতে পারে? তিনি বললেনঃ সে অন্য কোন লোকের পিতাকে গালি দেয়, তখন সে তার পিতাকে গালি দেয় এবং সে অন্যের মাকে গালি দেয়, তারপরে সে তার মাকে গালি দেয়। ( সহীহ আল বুখারী কিতাবুল আদাব হাদীস নং ৫৯৭৩)

জীবিত ব্যক্তির তো দূরে থাক ইসলাম মৃত ব্যক্তির সম্পর্কেও অশালীন ভাষা প্রয়োগ করতে বাধা ও নিষিদ্ধা করেছে।

عن عائشة رضي الله عنها قالت قال النبي صلى الله عليه وسلم: لا تسبوا الأموات فإنهم قد أفضوا إلى ما قدم

অর্থ: আম্মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা থেকে বর্ণিত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তোমরা মৃতদের গালি দিও না; কারণ, তারা স্বীয় কর্মফল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ( সহীহ আল বুখারী কিতাবুল জানাইজ হাদীস নং ১৩৯৩)

মানুষ তো দূরের কথা প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশু ও আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টিকে সম্পর্কেও গালি ও অশালীন কথা বলতে নিষিদ্ধ করেছেন।

عن زيد بن خالد قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لا تسبوا الديك فإنه يوقظ للصلاة

অর্থ: হযরত যাইদ বিন খালিদ আল জোহানি থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন:  তোমরা মুরগাকে গালি দিওনা। কারণ সে সালাতের জন্য ডাক দেয়। ( সুনান আবু দাউদ কিতাবুল আদাব হাদীস নং ৫১০৩)

عن أبي هريرة قال: قال النبي صلى الله عليه وسلم: قال الله تعالى يؤذيني ابن آدم، يسب الدهر وأنا الدهر، بيدي الأمر، أقلب الليل والنهار 

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:  আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়, সময় ও যুগকে অশালীন ভাষা বলে। আমি যুগ ও অনন্তকাল সৃষ্টিকর্তা, দিন এবং রাত আমিই নিয়ে আসি এবং নিয়ে যায়। ( সহীহ আল বুখারী, কিতাবুত তাওহীদ হাদীস নং ৭৪৯১)

উক্ত আয়াত সমূহ ও আহাদীস এবং ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ দ্বারা স্পষ্ট যে, এক ধরণের বড় অপরাধ, যা মানুষের পরকালকে ধ্বংস করে, যার কারণে মানুষ অভিশপ্ত হয়, মানুষ কে নরকের পথে নিয়ে যায়। আমাদের করণীয় জীবনের প্রতেক মূহুর্তে গালি, অশালীন ভাষা প্রয়োগ থেকে মুক্ত থাকা।

হে আল্লাহ তুমি আমাদের সকলকে অপরাধমুক্ত কর, গালি ও অশালীন ভাষা প্রয়োগ থেকে দূরে থাকার তৌফিক দাও। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

ভারত বর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের অবদান। আব্দুর রাকিব নাদভী

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভূমিকা।

বাংলা ভাষায় ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব।