সকল মানুষ এক পিতার সন্তান

সকল মানুষ এক পিতার সন্তান

আব্দুর রাকিব নাদভী





ধর্ম-বর্ণ নিবিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষের আদি পিতা হলেন হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর সকল মানুষ হযরত আদম আঃ এর সন্তান অর্থাৎ বিশ্বের সকল মানুষ পরস্পর ভাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ।  কারণ পৃথিবীর প্রথম মানুষ হলেন হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং আমরা সারা মানব জগত তারই পুত্র সন্তান এই বিষয়ে স্বয়ং বিশ্ব সৃষ্টি কর্তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
يٰأَيُّهَا النّاسُ إِنّا خَلَقنٰكُم مِن ذَكَرٍ وَأُنثىٰ وَجَعَلنٰكُم شُعوبًا وَقَبائِلَ لِتَعارَفوا ۚ إِنَّ أَكرَمَكُم عِندَ اللَّهِ أَتقىٰكُم ۚ إِنَّ اللَّهَ عَليمٌ خَبيرٌ
হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে- সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।
উক্ত আয়াত ইতে স্পষ্ট যে , পৃথিবীর সকল মানুষ এক আদি পিতার সন্তান। জন্ম সূত্রে সকল মানুষ পরস্পর আত্মীয়। জন্মগত সূত্রে কোন মানুষ ওপর মানুষের প্রতি কোন মর্যাদা রাখেনা। জন্ম সূত্রে সকল মানুষ মর্যাদা ফজিলতের দিক দিয়ে সমান। কারণ সকল মানুষ এক পিতার সন্তান। সর্ব প্রথম যে ব্যক্তি এই সত্যকে অস্বীকার করে তার নাম হলো শয়তান। ইবলিস সর্ব প্রথম এই সত্যকে অস্বীকার করেছিল এবং বিপরীতে মনে করেছিল যে উত্স এবং জাতি সম্মানের মানদণ্ড। ইবলিশ শয়তান বলেছিল:
قالَ أَنا۠ خَيرٌ مِنهُ خَلَقتَنى مِن نارٍ وَخَلَقتَهُ مِن طينٍ
সে বললঃ আমি তার চাইতে শ্রেষ্ট। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা।
বংশ বা দেশ অনুযায়ী সম্মানের মান নির্বাপিত করা বা সম্মানের উৎস বানানো শয়তানের অনুসারীদের কাজ হতে পারে, কিন্তু তা ঈমানদারদের শোভা পায় না। কিছু লোক তাদের বংশের জন্য গর্বিত বলে দাবি করে, যদিও তথ্য জ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং অজ্ঞতার স্পষ্ট প্রকাশ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাণীর মাধ্যমে বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
عن جبير بن مطعم أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: ليس منا من دعا إلى عصبية وليس منا من قاتل على عصبية وليس منا من مات على عصبية.
হযরত জুবাইর ইবনু মত্বইম রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম বলেন যে ব্যক্তি আসাবিয়্যাত অর্থাৎ পক্ষপাতিত্বর দিকে মানুষকে আহবান করে সে আমার দলভুক্ত নয় আর ব্যক্তিও আমার দলভুক্ত নয় যে অসহিয়াতের ভিত্তিতে যুদ্ধ করে এবং সেও নয় যে অসহিয়াতের উপর মারা যায়
সুনানে আবু দাউ ,শিষ্টাচারের অধ্যায় অনুচ্ছেদ 112 দল প্রীতি পক্ষপাতিত্ব হাদীস নং ৫১২১ )
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন :
عن أبي هريرة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: اثنتان في الناس هما بهم كفر الطعن في النسب والنياحة على الميت.
অর্থাৎ হযরত আবু হুরাইরাহ রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : দুই প্রকারের কর্ম কাফেরদের কর্মের অন্তর্ভুক্ত  (1)  বংশের ভিত্তিতে মানুষকে অপমান করা (2) মৃত্যু ব্যক্তির প্রতি শোক , মাতাম বা বিলাপ করা
عن أبي هريرة قال : قال رسول الله - صلى الله عليه وسلم  إن الله عز وجل قد أذهب عنكم عبية الجاهلية وفخرها بالآباء مؤمن تقي ، وفاجر شقي ، أنتم بنو آدم ، وآدم من تراب ، ليدعن رجال فخرها بأقوام ، إنما هم فحم من فحم جهنم ، أو ليكونن أهون على الله من الجعلان التي تدفع بأنفها النتن
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ মহান আল্লাহ তোমাদের জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার ও পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করার প্রথাকে বিলুপ্ত করেছেন। মু'মিন হলো আল্লাহভীরু আর পাপী হলো দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদম সন্তান আর আদম (আঃ) মাটির তৈরী। লোকদের উচিৎ বিশেষ গোত্রের ভুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে অহংকার না করা। এখন তো তারা জাহান্নামের কয়লায় পরিণত হয়েছে। অন্যথায় তোমরা মহান আল্লাহর নিকট ময়লার সেই কীটের চেয়েও জঘন্য গণ্য হবে যে তার নাক দিয়ে ময়লা ঠেলে নিয়ে যায়।
(সুনানে আবু দাউ, শিষ্টাচারের অধ্যায় অনুচ্ছেদ 111 হাদীস নং ৫১২১)
উক্ত আয়াত এবং হাদিসসমূহ  থেকে স্পষ্ট যে  ইসলাম ধর্মে বংশ গোত্রের ভিত্তিতে কোন ব্যক্তিকে মর্যাদা সম্মান প্রদান করে না সম্মান ফজিলতের অধিকারী এক মাত্র ব্যক্তি যে  আল্লাহ ভীরু সর্বাধিক পরহেযগার এই মর্মে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
إِنَّ أَكرَمَكُم عِندَ اللَّهِ أَتقىٰكُم
নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে- সর্বাধিক মর্যাদা সম্মানের অধিকারী যে সর্বাধিক পরহেযগার। (সুরা আল হুজুরাত আয়াত নং ১৩ )
عن جابر بن عبد الله -رضي الله عنه- قال: قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم-: (يا أيها الناسُ! إنَّ ربَّكم واحدٌ، وإن أباكم واحدٌ، ألا لا فضلَ لعربيٍّ على عجميٍّ، ولا لعجميٍّ على عربيٍّ، ولا لأحمرَ على أسودَ، ولا لأسودَ على أحمرَ إلا بالتقوى
হে মানুষ সম্প্রদায় তোমাদের রব এক তোমরা একই পিতার সন্তান দেশ এবং রঙের ভিত্তিতে কোন মানবকে কোন মানবের প্রতি কোন মর্যাদা প্রদান করা হয়নি আল্লাহর নিকট শুধু ব্যক্তি সর্বাধিক মর্যাদা এবং সম্মানের অধিকারী যে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক আল্লাহ ভীরু পরহেযগার।  অর্থাৎ আরবদের উপর আজমীদের কোন মর্যাদা নেই এবং আজমিদের উপর আরবদের কোন মর্যাদা নেই, কালো মানুষের উপর সাদা রঙের মানুষের কোনো মর্যাদা নেই, এবং সাদা রঙের মানুষের উপর কোলো রঙের মানুষের কোনো মর্যাদা নেই, আল্লাহর নিকট শুধু ব্যক্তি সর্বাধিক মর্যাদা এবং সম্মানের অধিকারী যে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক আল্লাহ ভীরু পরহেযগার।  হযরত আলী রাঃ বলেন:
لَعَمرُكَ ما الإِنسانُ إِلّا بِدينِهِ                               فَلا تَترُكِ التَقوى اِتِّكالاً عَلى النَسَب
فَقَد رَفَعَ الإِسلامُ سَلمانَ فارِسٍ                          وَقَد وَضَعَ الشِركُ الشَريفَ أَبا لَهَب
আল্লাহর কসম ! মানুষ শুধু মাত্র দ্বীনের ভিত্তীতে সম্মান লাভ করে, তাকওয়া ও পরহেযগারী ত্যাগ করে বংশ ও গোত্রের উপর ভরসা করে নয় কারণ ইসলাম ও ঈমানের ভিত্তীতে হযরত সালমান ফারসী সম্মানের উচ্চ স্তরে পৌঁছে যান, এবং শিরক আবু লাহাব কে অপমান ধ্বংস করে।

Comments

Popular posts from this blog

ভারত বর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে শেরশাহবাদি সম্প্রদায়ের অবদান। আব্দুর রাকিব নাদভী

শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভূমিকা।

বাংলা ভাষায় ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব।