মীরাস সঠিক পদ্ধতিতে বণ্টন নাকরার ভয়াবহ পরিণতী
মীরাস সঠিক পদ্ধতিতে বণ্টন নাকরার ভয়াবহ পরিণতী
আশফাক আহমদ রেজাউর রহমান তাইমী
অনুবাদক: আব্দুর রাকিব নাদভী
এটি একটি স্বীকৃত সত্য যে ইসলাম ন্যায় ও কল্যাণের মূর্ত প্রতীক। ইসলাম ধর্মের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো, এই ধর্মে ন্যায় ও ন্যায্যতার বিবেচনায় সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার ও কর্তব্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহর নির্দেশ :
لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ ٱلْوَٰلِدَانِ وَٱلْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَآءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ ٱلْوَٰلِدَانِ وَٱلْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ ۚ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا
পিতামাতা ও নিকট-আত্মীয়রা যা সম্পদ রেখে যায় তার একটি অংশ পুরুষদের জন্য, আর স্ত্রীলোকদের জন্যেও থাকবে একটি অংশ যা পিতামাতা ও নিকট-আত্মীয়রা রেখে যায় তার, -- তা কমই হোক বা বেশি, --একটি নির্দিষ্ট অংশ। (আল-নিসা': 7)
অর্থাৎ পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের সম্পদে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও অংশ নির্ধারিত রয়েছে।আয়াতটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন:
অন্ধকার যুগে আরব নগরীতে মুশরিকদের প্রথা ছিল যে , কেউ মৃত্যুবরণ করলে , তার পূর্ণ সম্পদ তার বড় পূত্র পাবে, অন্যান্য সন্তান সন্তাদি, বিশেষ করে যুবক-যুবতী ও নারীরা মৃত্যু ব্যক্তির সম্পদ থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হতো। ইসলাম এসে সকলের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে । এবং স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে মৃত্যু ব্যক্তির সম্পদে প্রত্যেকেরই কম-বেশি অংশ রয়েছে । মীরাস যদি সঠিক রূপে বণ্টন না হয় , তবে এটিকে অত্যাচার
হিসাবে বিবেচনা করা হবে। আর যে সকল ব্যক্তি এই কাজে লিপ্ত রয়েছে তাদের জন্য লজ্জাজনক শাস্তির সুসংবাদ রয়েছে ৷ আল্লাহ বলেন:
وَمَن يَعْصِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَتَعَدَّ حُدُودَهُۥ يُدْخِلْهُ نَارًا خَٰلِدًا فِيهَا وَلَهُۥ عَذَابٌ مُّهِينٌ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর সীমা অতিক্রম করবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (আল-নিসা: 14)
ওরেসদেরকে মীরাস থেকে বঞ্চিত করা এক ধরনের অত্যাচার এবং যারা এই কাজ করে তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে বিপদজনক শাস্তি রয়েছে । ওয়ারিশদেরকে সম্পত্তি থেকেবঞ্চিত করা হারাম আর যারা হারাম ভক্ষণ করে, তাদের দোয়া কবুল হয় না।এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
عن أبي هريرة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ((أيها الناس إن الله طيب لا يقبل إلا طيبا وإن الله أمر المؤمنين بما أمر به المرسلين فقال: {يا أيها الرسل كلوا من الطيبات واعملوا صالحا إني بما تعملون عليم} وقال: {يا أيها الذين آمنوا كلوا من طيبات ما رزقناكم})). ثم ذكر الرجل يطيل السفر أشعث أغبر يمد يديه إلى السماء يا رب يا رب ومطعمه حرام ومشربه حرام وملبسه حرام وغذي بالحرام فأنى يستجاب لذلك.
হে লোক সকল, আল্লাহ রব্বুল আলামিন পবিত্র এবং শুধুমাত্র পবিত্রতাকে গ্রহণ করেন। আর আল্লাহ মুমিনদেরকে ও আদেশ করেছেন যা তিনি রসূলদেরকে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “হে রসূল! উত্তম জিনিস খাও এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা করছ সে সন্বন্ধে আমি নিশ্চয়ই সর্বজ্ঞাতা। আল্লাহ আরো বলেনঃ হে বিশ্বাসীগণ! পবিত্র জিনিস খাও যা আমি তোমাদের খেতে দিয়েছি । এর পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এমন একজন ব্যক্তির কথা বললেন, যে লম্বা সফরে বের হয়েছে , সফরের কারণে মাথার চুল গুলো গুলো এলোমেলো হয়ে পড়েছে, এমত অবস্থায় সে আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে চিৎকার করে বলে : হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক! কিন্তু তার দূয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোনো সাড়া দেননা । রাসূল সাল্লাল্লাহু ইসলাম বলেন কেমনে তার দুয়া গ্রহণ হবে ? তার খাদ্য হারাম, তার পানাহার হারাম, তার পোশাক হারাম, , তাহলে কি তার দোয়া কবুল হবে?
পবিত্র হাদিস থেকে স্পষ্ট যে, মজলুম ব্যক্তিদের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। এই মর্মে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ কে বলেছিলেন :
اتق دعوة المظلوم، فإنها ليس بينها وبين الله حجاب.
হে মূয়াজ ! নিপীড়িত ( মাজলুম ) দের বদদূয়া থেকে ভয় করো, কারণ তাদের ও মহান আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা নেই । তাদের দুআ সরাসরি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন গ্রহণ করেন।
মিরাস সঠিকভাবে বন্টন না করায় পরকালে ক্ষতি কি ? এই সম্পর্কে নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১) যারা ওয়ারিশদের কে জমি জায়গা থেকে বেদখল করে ,অন্যায় ভাবে সম্পদ কেড়ে নেয় , পরকালের দিন তাদের গলায় সাত জমিন কে মালা স্বরূপ পড়ানো হবে।
عَنْ سَعِيدِ بْنِ زَيْدٍ قَالَ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ أَخَذَ شِبْرًا مِنَ الأَرْضِ ظُلْمًا فَإِنَّهُ يُطَوَّقُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ.
হযরত সাঈদ বিন জায়েদ রাজিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম কে বলতে শুনেছি , যে ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির জমিন অন্যায় ভাবে দখল করে , পরকালের দিন সাত জমিন মালা স্বরূপ তাকে পড়ানো হবে। ( সহি মুসলিম: ১৬১০)
২) মীরাস থেকে অনাথ ( য়াতীম ) ছেলেদেরকে বঞ্চিত করে দেওয়া একটি বড় অপরাধ । এই মর্মে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং বলেন:
إِنَّ ٱلَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَٰلَ ٱلْيَتَٰمَىٰ ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِى بُطُونِهِمْ نَارًا ۖ وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا
নিঃসন্দেহ যারা এতীমদের ধনসম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করে, তারা নিশ্চয়ই তাদের পেটে আগুন গিলে। আর তারা শীঘ্রই জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে ।
৩) যারা ধন সম্পদের লোভ লালসায় আত্মীয়-স্বজনকে তাদের মীরাস থেকে বঞ্চিত করে দেয় , তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
وَتَأْكُلُونَ التُّرَاثَ أَكْلًا لَمًّا وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمًّا َلَّا إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكًّا دَكًّا وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي
এবং তোমরা মৃতের ত্যাজ্য সম্পত্তি সম্পূর্ণরূপে কুক্ষিগত করে ফেল । এবং তোমরা ধন-সম্পদকে প্রাণভরে ভালবাস।এটা অনুচিত, যখন পৃথিবী চুর্ণ-বিচুর্ণ হবে। এবং আপনার পালনকর্তা ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবেন । এবং সেদিন জাহান্নামকে আনা হবে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু এই স্মরণ তার কি কাজে আসবে?সে বলবেঃ হায়, এ জীবনের জন্যে আমি যদি কিছু অগ্রে প্রেরণ করতাম!
৪) যারা মিরাসের মাল অন্যায় ভাবে দখল করে খায় তাদের কোন প্রকার সৎকর্ম আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হয় না এবং তাদের ঠিকানা হল জাহান্নাম। এই মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: أتدرون ما المفلس؟ . قالوا المفلس فينا من لا درهم له ولا متاع. فقال: إن المفلس من أمتي يأتي يوم القيامة بصلاة وصيام وزكاة ويأتي قد شتم هذا وقذف هذا وأكل مال هذا وسفك دم هذا وضرب هذا فيعطى هذا من حسناته وهذا من حسناته فإن فنيت حسناته قبل أن يقضى ما عليه أخذ من خطاياهم فطرحت عليه ثم طرح في النار.
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তোমরা কি বলতে পারো অভাবী লোক কে ? সাহাবা কেরাম উত্তর দিলেন: আমাদের মাঝে অভাবী ঐ ব্যক্তি যার নিকট টাকা কড়ি ও ধন সম্পদ নেই । তখন তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমার উম্মতের মধ্যে ঐ ব্যক্তি প্রকৃত অভাবী , যে কিয়ামতের দিন স্বলাত , সিয়াম ও যাকাত নিয়ে আসবে, সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, অমুকের সম্পদ ভোগ করেছে, অমুককে হত্যা করেছে, ও আরেকজনকে প্রহার করেছে। ঐ ব্যক্তির আমল থেকে লোকজনকে নেকি দেওয়া হবে। এরপর পাওনা দের হক তার নেক আমল থেকে যদি পূরণ না হয়। ঋণের পরিবর্তে তাদের পাপের একাংশ তার ওপর চাপানো হবে। শেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ( সহি মুসলিম হাদিস নং ৬৪৭৪)
উক্ত আয়াত ও হাদিস এবং ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, মীরাস ( উত্তরাধিকার ) হ্রাস করা বা অপব্যবহার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং বড় অপরাধ। ইসলাম ধর্ম ন্যায় ওসততার ধর্ম। ইসলাম ওয়ারিশদের অধিকার আদায়ের জন্য বহু আদেশ-নিষেধ জারি করেছে। প্রিয় নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন:
عن ابن عباس رضي الله عنهما عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: ألحقوا الفرائض بأهلها، فما بقي فهو لأولى رجل ذكر.
ইব্নু 'আব্বাস (রাঃ) সু্ত্রে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ সুনির্দিষ্ট অংশের হকদারদের মীরাস পৌছে দাও। অতঃপর যা বাকী থাকবে তা (মৃতের) নিকটতম পুরুষের জন্য।
( সহি আল বূখারী হাদীস নং : ৬৭৩২ )
বণ্টনের ক্ষেত্রে হৃদয়ের মধ্যে বিশ্বপালনকর্তা আল্লাহর ভয় থাকা খুবই জরুরী। উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টনে বাড়াবাড়ি ও অবিচার আশঙ্কা থাকে, তাই মহানবী (সা.) হজরত নুআমান ইবনে বশীর (রা.)-কে সম্বোধন করে বলেছিলেন:
فاتقوا الله، واعدلوا بين أولادكم
হে নুআমান ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মাঝে ইনসাফ কর।
( সহীহ আল-বুখারী হাদীস নং ২৫৮৭ )
বন্টনের সময় যেন কোন ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণানা হয় । তাই আমাদেরকে অত্যন্ত সততা ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে যাতে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকে। এবং ভ্রাতৃত্বের মধ্যে কোনো রকম যেন ফাটল না ধরে ।
পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে সম্পদ বণ্টনে সুবিচার করার তৌফিক দান করেন, জুলুম ও বিশ্বাসঘাতকতা থেকে রক্ষা করেন।
আমিন।


Comments
Post a Comment