আল্লাহর পরিচয়
আল্লাহর পরিচয়
আব্দুর রাকিব নদভী
আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক নর-নারী, বিশেষ করে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য । মানুষ যার উপাসনা ও পূজা করে, তার সম্পর্কে জ্ঞান রাখা একান্ত দরকার। নিজ উপাস্যকে না চিনে কি করে মানুষ তার এবাদত করে ? তাই আসুন আল্লাহ যিনি একমাত্র উপাসনার অধিকারী, তার সম্পর্কে কিছু জ্ঞান লাভ করি।
" আল্লাহ " শব্দটি হল আরবি শব্দ। সৃষ্টিকর্তার সত্তাবাচক নাম। ইলাহ " اله শব্দ থেকে গঠন হয়েছে যার অর্থ হলো উপাস্য বা মাবুদ। মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং বলেন:
إِنَّنى أَنَا اللَّهُ لا إِلٰهَ إِلّا أَنا۠ فَاعبُدنى وَأَقِمِ الصَّلوٰةَ لِذِكرى
অর্থাৎ নিশ্চয় আমিই আল্লাহ। আমি ছাড়া কোন উপাস্য নেই। অতএব তুমি আমারই এবাদত কর। এবং আমাকে স্মরণ করার জন্য স্বলাত কায়েম কর।
( সুরা ত্বহা আয়াত নং ১৪)
আল্লাহ শব্দটি এমন এক শব্দ যার কোন বহুবচন হয় না। আর আরবি ভাষায় তার কোনো প্রতিশব্দ নেই। তিনি হলেন এক অদ্বিতীয় । তিনি ছাড়া কেউ উপাসনার অধিকারী নন। তিনি অনন্ত ও অনাদি। তিনি চিরকাল ছিলেন, চিরকাল আছেন এবং চিরকাল থাকবেন।
অর্থাৎ তিনি তখনও ছিলেন যখন কেউ বা কিছুই ছিল না। এবং তখনও থাকবেন যখন কেউ বা কিছু থাকবে না । তিনি হলেন ধ্বংসের ঊর্ধ্বে । তিনি ছাড়া সবকিছুই ধ্বংসশীল । তিনি হলেন সবকিছুর মালিক। কেউ তার সমতুল্য নেই । আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। প্রতিটি প্রাণী বস্তু ও শক্তির অস্থিত্ব রক্ষার জন্য বা টিকে থাকার জন্য তাঁর মুখাপেক্ষী । কোন সৃষ্টি তাকে দেখতে পায় না, কিন্তু সবকিছু তার দৃষ্টির অধীন। আল্লাহর দৃষ্টির বা ক্ষমতার বাইরে কোন কিছু থাকা সম্ভব নয়। তিনি কারো সন্তান নন অর্থাৎ তার বাবা-মা নেই। তাঁর কোন সন্তান, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা কেউ নেই। তিনিই হলেন সর্বশক্তিমান। তাঁর জ্ঞান হলো সীমাহীন। তিনিই হলেন জীবন এবং মরণের মালিক। তিনিই হলেন রোজি দাতা। তাঁকে কখনো তন্দ্রা ( ঘুমঘোর ) নিন্দ্রা ( ঘুম ) ছুঁতে পারে না। আল্লাহ যা ইচ্ছা তা সৃষ্টি করতে পারেন। তিনিই হলেন সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। আকাশ ও জমিনের সম্রাট ও সৃষ্টি কর্তা হলেন তিনিই। তার সাম্রাজ্যের মালিকানায় ও পরিচালনায় কোন শক্তি বস্তু বা সৃষ্টি অংশীদার নেই। তাঁর অনুমতি ছাড়া কারো উপর বিপদ আসতে পারে না। যদি তিনি কারো কল্যাণ করতে চান তাতে বাঁধা দেবার শক্তি কারো নেই । এবং তিনি যদি কারো ক্ষতি করতে চান তা প্রতিরোধ করার শক্তি কারো নেই তিনিই হলেন পরম দয়ালু ও করুণাময় । তাঁর যা কিছু ইচ্ছা তা করতে পারেন। যা করেন তার জন্য কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না,কিন্তু সকলকে তার নিকট জবাবদিহি করতে হয়। তিনি হলেন সর্ব ক্ষমতাশীল এবং কঠোর শাস্তিদাতা । তিনি হলেন সর্ব জ্ঞানী সবকিছু শুনেন এবং দেখেন। কোন সৃষ্টি তাকে দেখতে পায় না। তিনি হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ও সকল প্রশংসার অধিকারী। তিনি হলেন বরকত ময় ও সবরকম ইজ্জত সম্মানের মালিক।
এক কথায় বলি , পৃথিবীর সবগুলো গাছকে যদি কলম ও সমস্ত সমুদ্রের পানিকে কালি বানানো হয় তবুও আল্লাহর প্রশংসা লিখে শেষ করা যাবে না। একথা স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে বলেন:
قُل لَو كانَ البَحرُ مِدادًا لِكَلِمٰتِ رَبّى لَنَفِدَ البَحرُ قَبلَ أَن تَنفَدَ كَلِمٰتُ رَبّى وَلَو جِئنا بِمِثلِهِ مَدَدًا
অর্থাৎ হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম আপনি বলুন: আমার পালনকর্তার কথা, লেখার জন্যে যদি সমুদ্রের পানি কালি হয়, তবে আমার পালনকর্তার কথা, শেষ হওয়ার আগেই সে সমুদ্র নিঃশেষিত হয়ে যাবে। সাহায্যার্থে অনুরূপ আরেকটি সমুদ্র এনে দিলেও।
( সুরা আল কাহাফ আয়াত নং ১০৯)
সংক্ষেপে যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে আমরা চিনতে চাই বা তাঁর সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে চাই, তবে আমাদের জন্য সূরা আল ইখলাস যথেষ্ট । সূরা ইখলাস দ্বারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় যথেষ্ট রূপে দিয়েছেন । আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ، اللَّهُ الصَّمَدُ ،لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ،وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ .
অর্থাৎ হে নবী আপনি বলুন: আল্লাহ এক । আল্লাহ মুখাপেক্ষীহীন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকে কেউ জন্ম দেয়নি। এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।
( সুরা আল- ইখলাস আয়াত নং : ১- ৪)
এমন একজন সত্তার নাম হল আল্লাহ । তিনিই হলেন আমাদের সকলের সৃষ্টিকর্তা এবং রব । তিনিই ছাড়া কোন শক্তি, বস্তু বা সৃষ্টি উপাসনা, পূজা ও এবাদতের যোগ্য বা অধিকারী নয়। পৃথিবীতে যত রকমের মিথ্যা উপাস্য বা মাবুদ রয়েছে, তাদেরকে এই পবিত্র সূরা ইখলাস দ্বারা পরীক্ষা করা সম্ভব । তারা উপাস্য ও এবাদতের যোগ্য বা অধিকারী কি-না ? তারা ঈশ্বর কি না ? আমরা তাদেরকে সূরা আল ইখলাস দাঁড়া যাচাই বা পরিক্ষা করতে পারি । যদি তারা সূরা আল- ইখলাসের পরীক্ষায় পাস করতে পারে , যদি তাদের মধ্যে ঐ বৈশিষ্ট্যগুলো পূর্ণাঙ্গরূপে পাওয়া যায় , তবে তাদেরকে উপাস্য বা মাবুদ বলে গণ্য করা যায়। কিন্তু এই সূরার মধ্যে চারটি এমন গুণ-বৈশিষ্ট্য ও সিফাত বর্ণনা করা হয়েছে, যা আল্লাহ ব্যতীত কোন শক্তি বস্তুর বা সৃষ্টির মধ্যে নেই । তবে তারা কি করে উপাস্য বা মাবুদ হতে পারে ? আল্লাহর ঐ চারটি গুণ বা বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ :-
(১) আল্লাহ এক, অদ্বিতীয়।
(২) আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। সকল জ্বীব, সৃষ্টি, বস্তু ও শক্তি তাঁর মুখাপেক্ষী।
(৩) আল্লাহ কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকে কেউ জন্ম দেয়নি।
(৪) কেউ আল্লাহর সমতুল্য নয়।
উক্ত চারটি গুণ বা বৈশিষ্ট্য যদি কারো মধ্যে পূর্ণাঙ্গরূপে পাওয়া যায়, তবে সে উপাস্য বা মাবুদ। আর যদি উক্ত চারটি গুণ ও বৈশিষ্ট্য কোন উপাস্যের মধ্যে পূর্ণাঙ্গরূপে না পাওয়া যায়, তবে সে মিথ্যা উপাস্য বলে বিবেচিত হবে। এবং মিথ্যা উপাস্য ও মাবুদ থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক নর-নারী ও মানবের একান্ত কর্তব্য। তা নাহলে মানুষ মূশরিক থাকার কারণে নরকে যাবে। স্বয়ং আল্লাহ বলেন:
إِنَّهُ مَن يُشرِك بِاللَّهِ فَقَد حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيهِ الجَنَّةَ وَمَأوىٰهُ النّارُ
নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম।
( সুরা আল- মায়েদা আয়াত নং: ৭২)
আল্লাহর পরিচয় , ক্ষমতা , গুণাবলী , বৈশিষ্ট্য ও সিফাত সম্পর্কে পবিত্র আল-কুরআনে হাজার হাজার আয়াত রয়েছে, সমস্ত আয়াত এখানে তুলে ধরা সম্ভব নয়। বিস্তারিত জানার জন্য মহাগ্রন্থ আল - কুরআন পাঠের অনুরোধ থাকলো। প্রিয় পাঠকদের জন্য মাত্র কয়েকটি আয়াত এখানে তুলে ধরা হলো।
সূরা আল হাশরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজের পরিচয় সম্পর্কে বলেন:
هُوَ اللَّهُ الَّذى لا إِلٰهَ إِلّا هُوَ ۖ عٰلِمُ الغَيبِ وَالشَّهادَةِ ۖ هُوَ الرَّحمٰنُ الرَّحيمُ ، هُوَ اللَّهُ الَّذى لا إِلٰهَ إِلّا هُوَ المَلِكُ القُدّوسُ السَّلٰمُ المُؤمِنُ المُهَيمِنُ العَزيزُ الجَبّارُ المُتَكَبِّرُ ۚ سُبحٰنَ اللَّهِ عَمّا يُشرِكونَ هُوَ اللَّهُ الخٰلِقُ البارِئُ المُصَوِّرُ ۖ لَهُ الأَسماءُ الحُسنىٰ ۚ يُسَبِّحُ لَهُ ما فِى السَّمٰوٰتِ وَالأَرضِ ۖ وَهُوَ العَزيزُ الحَكيمُ
অর্থাৎ: তিনিই আল্লাহ , তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যকে জানেন । তিনি পরম দয়ালু, অসীম দাতা। তিনিই আল্লাহ তিনি ব্যতিত কোন উপাস্য নেই। তিনিই একমাত্র মালিক, পবিত্র, শান্তি ও নিরাপত্তাদাতা, আশ্রয়দাতা, পরাক্রান্ত, প্রতাপান্বিত, মাহাত্মশীল। তারা যাকে অংশীদার করে আল্লাহ তা’ আলা তা থেকে পবিত্র। তিনিই আল্লাহ , স্রষ্টা, উদ্ভাবক, রূপদাতা, উত্তম নাম সমূহ তাঁরই। নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে, সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তিনি পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়।
( সুরা আল-হাশর আয়াত নং: ২২ - ২৪ )
সূরা আল ইমরানে বলা হয়েছে:
قُلِ اللَّهُمَّ مٰلِكَ المُلكِ تُؤتِى المُلكَ مَن تَشاءُ وَتَنزِعُ المُلكَ مِمَّن تَشاءُ وَتُعِزُّ مَن تَشاءُ وَتُذِلُّ مَن تَشاءُ ۖ بِيَدِكَ الخَيرُ ۖ إِنَّكَ عَلىٰ كُلِّ شَيءٍ قَديرٌ
বলুন : হে আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত কর। তোমারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।
( সুরা আল- ইমরান আয়াত নং: ২৬)
সূরা আর-রূমে আল্লাহ বলেন:
اللَّهُ الَّذى خَلَقَكُم ثُمَّ رَزَقَكُم ثُمَّ يُميتُكُم ثُمَّ يُحييكُم هَل مِن شُرَكائِكُم مَن يَفعَلُ مِن ذٰلِكُم مِن شَيءٍ سُبحٰنَهُ وَتَعٰلىٰ عَمّا يُشرِكونَ
অর্থাৎ আল্লাহ সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তোমাদেরকে রিজিক দিয়েছেন। এরপর তোমাদেরকে মৃত্যু দিবেন এবং এরপর তিনিই তোমাদেরকে জীবিত করবেন। তোমাদের শরিকদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি যে এসব কাজের মধ্যে কোন কিছু করতে পারবে? তারা যাকে শরীক করে আল্লাহ তা থেকে পবিত্র ও মহান।
( সুরা আল- রূম আয়াত নং: ৪০)
সূরা আল বাকারা আয়াত নং ২৫৫ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
اللَّهُ لا إِلٰهَ إِلّا هُوَ الحَىُّ القَيّومُ ۚ لا تَأخُذُهُ سِنَةٌ وَلا نَومٌ ۚ لَهُ ما فِى السَّمٰوٰتِ وَما فِى الأَرضِ ۗ مَن ذَا الَّذى يَشفَعُ عِندَهُ إِلّا بِإِذنِهِ ۚ يَعلَمُ ما بَينَ أَيديهِم وَما خَلفَهُم ۖ وَلا يُحيطونَ بِشَيءٍ مِن عِلمِهِ إِلّا بِما شاءَ ۚ وَسِعَ كُرسِيُّهُ السَّمٰوٰتِ وَالأَرضَ ۖ وَلا يَـٔودُهُ حِفظُهُما ۚ وَهُوَ العَلِىُّ العَظيمُ
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি চিরজীবি, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।
( সুরা আল- বাক্বারাহ আয়াত নং ২৫৫ )
প্রার্থনা, আল্লাহ যেন আমাদেরকে নিজ উপাস্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং উপাস্যকে চেনে, তাঁর উপাসনা করার তৌফিক দান করেন। আমীন।
Comments
Post a Comment